প্রাচীন ইতিহাস হয় অতীত ঘটনার সমষ্টিগত যা মানব ইতিহাসের শুরু থেকে প্রতিষ্ঠিত, প্রাচীন বিশ্বের মানুষ অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছেন, তৈরী করেছেন বিস্ময়কর স্থাপত্যশিল্প। আর সেই কাহিনী ছড়িয়ে অাছে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন আকৃতিতে সেই কাহিনী একবার শুনলে তা স্মৃতি হয়ে গাঁথা থাকে মানুষের মনে যুগে যুগে.......
Showing posts with label প্রাচীন বাংলার ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label প্রাচীন বাংলার ইতিহাস. Show all posts
Saturday, 30 September 2017
প্রাচীন বাংলার জনপদ
ইতিহাস বিষয়ক আলোচনায় যুগের বিভাজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাবের কার্যকারিতা
নিয়েই এ যুগ বিভাজন নির্ণয় করা হয়ে থাকে। সাধারণত ইতিহাসে খ্রিষ্টপূর্ব
কয়েক শতক পূর্বের সময় থেকে খ্রিষ্টীয় পঞ্চম শতকেই প্রাচীনকাল বা যুগ বলে
ধরা হয়ে থাকে। তবে অঞ্চল ভেদে কালবিভাজনের তারতম্যও লক্ষ্য করা যায়।
খ্রিষ্টীয় তেরো শতকের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় দু’ হাজার বছরের সময়কে
বাংলার প্রাচীন যুগ বলে ধরা হয়ে থাকে।
প্রাচীন যুগে বাংলা (বর্তমানের বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গ) এখনকার বাংলাদেশের
মতো কোনো একক ও অখণ্ড রাষ্ট্র বা রাজ্য ছিল না। বাংলার বিভিন্ন অংশ তখন
অনেকগুলো ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। আর প্রতিটি অঞ্চলের শাসক যার যার মতো
শাসন করতেন। বাংলার এ অঞ্চলগুলোকে তখন সমষ্টিগতভাবে নাম দেয়া হয় ’জনপদ’।
জনপদ
চতুর্থ শতক হতে গুপ্ত যুগ, গুপ্ত পরবর্তী যুগ, পাল, সেন প্রভৃতি আমলের
উৎকীর্ণ শিলালিপি ও সাহিত্য গ্রনে' প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর নাম পাওয়া
যায়। এসব জনপদ ঠিক কোথায় কতখানি জায়গা জুড়ে ছিল তা বলা যায় না। তবে
প্রাচীনকালের প্রাপ্ত বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদান হতে তাদের অবস্থান সম্বন্ধে
মোটামুটি আঁচ পাওয়া যায়। নিচে কয়েকটি জনপদের বর্ণনা দেয়া হলো।
গৌড় :
গৌড় নামটি সুপরিচিত হলেও প্রাচীনকালে গৌড় বলতে ঠিক কোন অঞ্চলকে বোঝাত এ
নিয়ে প্রচুর মতভেদ আছে। আর যে এলাকা গৌড় বলে অভিহিত হতো কেনই বা সে অঞ্চল এ
নামে অভিহিত হতো আজ পর্যন্ত সেটাও সঠিকভাবে জানা যায় নি। পাণিনির গ্রনে'
সর্বপ্রথম গৌড়ের উলে- দেখা যায়। কৌটিল্যের “অর্থশাস্ত্র’ গ্রনে' গৌড়খ দেশের
অনেক শিল্প ও কৃষিজাত দ্রব্যের উলে- পাওয়া যায়। ব্যাৎসায়নের গ্রনে'ও তৃতীয়
ও চতুর্থ শতকে গৌড়েরখ নাগরিকদের বিলাস-ব্যসনের পরিচয় পাওয়া যায়।
হর্ষবর্ধনের শিলালিপি হতে প্রমাণিত হয় যে, সমুদ্র উপকূল হতে গৌড়দেশ খুব
বেশি দূরে অবসি'ত ছিল না। ষষ্ঠ শতকে লেখা বরাহ মিহিরের বিবরণ হতে দেখা যায়
যে, গৌড় অন্যান্য জনপদ, যথা- পুন্ড্র, বঙ্গ, সমতট থেকে আলাদা একটি জনপদ।
“ভবিষ্য পুরাণ’-এ একে পদ্মা নদীর দক্ষিণে এবং বর্ধমানের উত্তরে অবসি'ত
অঞ্চল বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এ উক্তির সঙ্গে সপ্তম শতকের লোকদের বর্ণনার
যথেষ্ট সামঞ্জস্য আছে। সপ্তম শতকে গৌড়রাজ শশাংকের রাজধানী ছিল
মুর্শিদাবাদের নিকটবর্তী কর্ণসুবর্ণ। আর শুধু বা শশাংকই কেন, পরবর্তীকালে
আরও অনেকের রাজধানী ছিল এই গৌড়।
পাল রাজাদের আমলে গৌড়ের নাম-ডাক ছিল সবচেয়ে বেশি। উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ
অঞ্চল তখন গৌড়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস'ল হওয়ায় তার প্রতাপ
ছিল অপ্রতিহত। পরবর্তীকালে পাল সাম্রাজ্যের ভাগ্য পরিবর্তনের সাথে সাথে
গৌড়ের ভাগ্যও পরিবর্তিত হয়ে যায়। গৌড়ের সীমা তখন সীমাবদ্ধ হয়ে আসে। আধুনিক
মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের কিছু অংশ গৌড়ের সীমানা বলে মনে করা
হয়। সপ্তম শতকে গৌড়রাজ শশাংকের রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণ।
মুসলমান যুগের শুরুতে মালদহ জেলার লক্ষণাবতী গৌড় নামে অভিহিত হতো। পরে গৌড়
বলতে সমগ্র বাংলাকে বুঝাত।
বঙ্গ :
বঙ্গ একটি অতি প্রাচীন জনপদ। অতি প্রাচীন পুঁথিতে একে মগধ ও কলিঙ্গ জনপদের
প্রতিবেশী বলা হয়েছে। মহাভারতের উলে- হতে বুঝা যায় যে, বঙ্গ, পুন্ড্র,
তাম্রলিপ্ত ও সুহ্মের সংলগ্ন দেশ। চন্দ্রগুপ্ত, বিক্রমাদিত্য, চালুক্যখ
রাজা ও রাষ্ট্রকূটদের শিলালিপি এবং কালিদাসের গ্রনে' এ জনপদের বর্ণনা পাওয়া
যায়। বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গ নামে একটি জনপদ
গড়ে উঠেছিল। অনুমান করা হয়, এখানে “বঙ্গ’ নামে এক জাতি বাস করত। তাই জনপদটি
পরিচিত হয় “বঙ্গ’ নামে। সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে মনে হয়, গঙ্গা ও ভাগিরথীর
মাঝখানের অঞ্চলকেই বঙ্গ বলা হতো। পাল ও সেন বংশীয় রাজাদের আমলে বঙ্গের আয়তন
সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। একাদশ শতকে পাল বংশের শেষ পর্যায়ে বঙ্গ জনপদ দুভাগে
বিভক্ত হয়ে উত্তর বঙ্গ ও দক্ষিণ বঙ্গ নামে পরিচিত হয়। পদ্মা ছিল
উত্তরাঞ্চলের উত্তর সীমা, দক্ষিণের বদ্বীপ অঞ্চল ছিল দক্ষিণ বঙ্গ।
পরবর্তীকালে কেশব সেন ও বিশ্বরূপ সেনের আমলেও বঙ্গের দুটি ভাগ পরিলক্ষিত
হয়। তবে এবার নাম আলাদ- একটি ’বিক্রমপুর’ ও অপরটি “নাব্য’। প্রাচীন
শিলালিপিতে “বিক্রমপুর’ ও “নাব্য’ নামে বঙ্গের দুটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়।
বর্তমান বিক্রমপুর পরগনা ও তার সাথে আধুনিক ইদিলপুর পরগনার কিয়দংশ নিয়ে
ছিল বিক্রমপুর। নাব্য বলে বর্তমানে কোন জায়গার অস্তিত্ব নেই। ধারণা করা হয়,
ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালীর নিম্ন জলাভূমি এ নাব্য অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত
ছিল। বৃহত্তর বগুড়া, পাবনা, ময়মনসিংহ জেলার পশ্চিমাঞ্চল, ঢাকা, ফরিদপুর,
কুষ্টিয়া, বৃহত্তর কুমিল- ও নোয়াখালীর কিছু অংশ নিয়ে বঙ্গ গঠিত হয়েছিল।
“বঙ্গ’ থেকে “বাঙালি’া জাতির উৎপত্তি ঘটেছিল।
পুন্ড্র:
প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো পুন্ড্র। বলা হয়
যে, “পুন্ড্র’ বলে এক জাতি এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বৈদিক সাহিত্য ও মহাভারতে এ
জাতির উলে- আছে। পুন্ড্রদের রাজ্যের রাজধানীর নাম পুন্ড্রনগর।খ
পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। সম্ভবত মৌর্য সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে
(খ্রিঃ পূ: ২৭৩-২৩২ অব্দ) প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্য স্বাধীন সত্তা হারায়।
সমৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে তা পুন্ড্রবর্ধনে রূপান্তরিত
হয়েছে। সে সময়কার পুন্ড্রবর্ধন অন্তত বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলা জুড়ে
বিস-ৃত ছিল। রাজমহল- গঙ্গা-ভাগীরথী হতে আরম্ভ করে করতোয়া পর্যন্ত মোটামুটি
সমস্ত উত্তর বঙ্গই বোধহয় সে সময় পুন্ড্রবর্ধনের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেন আমলে
পুন্ড্রবর্ধনের দক্ষিণতম সীমা পদ্মা পেরিয়ে একেবারে খাড়ি বিষয় (বর্তমান
চব্বিশ পরগনার খাড়ি পরগনা) ও ঢাকা- বরিশালের সমুদ্র তীর পর্যন্ত বিস-ৃত
ছিল। বগুড়া হতে সাত মাইল দূরে মহাস্থানগড় প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন নগরীর
ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা অনুমান করেন।
প্রাচীন সভ্যতার নির্দশনের দিক দিয়ে পুন্ড্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে
সমৃদ্ধ জনপদ। বাংলাদেশে প্রাপ্ত পাথরের চাকতিতে খোদাই করা সম্ভবত প্রাচীনতম
শিলালিপি এখানে পাওয়া গেছে।
হরিকেল :
সাত শতকের লেখকেরা হরিকেল নামে অপর এক জনপদের বর্ণনা করেছেন। চীনা
ভ্রমণকারী ইৎসিং বলেছেন, হরিকেল ছিল পূর্ব ভারতের শেষ সীমায়। আবার কারো
কারো লিপিতে হরিকেলের যে পরিচয় পাওয়া যায় তাতে বর্তমান চট্টগ্রামেরও অংশ
খুঁজে পাওয়া যায়। সমস্ত তথ্য পর্যালোচনা করে ধরে নেওয়া যায় যে, পূর্বে
শ্রীহট্ট (সিলেট) থেকে চট্টগ্রামের অংশ বিশেষ পর্যন্ত হরিকেল জনপদ বিস-ৃত
ছিল। যদিও মধ্যখানে সমতট রাজ্যের অবসি'তি ছিল- যা কিছুটা বিভ্রান্তি সৃষ্টি
করতে পারে। আসলে তখন জনপদের কোথাও কোথাও বেশ শিথিল অবস্থা বিরাজ করছিল। তা
ছাড়া বঙ্গ, সমতট ও হরিকেল- তিনটি পৃথক জনপদ হলেও এরা খুব নিকট প্রতিবেশি
হওয়ায় কখনো কখনো কোনো কোনো এলাকায় অন্য জনপদের প্রভাব বিরাজ করত বলে ধারণা
করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, সপ্তম ও অষ্টম শতক হতে দশ ও এগারো শতক পর্যন্ত হরিকেল
একটি স্বতন্ত্র রাজ্য ছিল। কিন্তু পূর্ব-বাংলার চন্দ্র রাজবংশের রাজা
ত্রৈলোক্যচন্দ্রের চন্দ্রদ্বীপ অধিকারের পর হতে হরিকেলকে মোটামুটি বঙ্গের
অংশ বলে ধরা হয়। অনেকে আবার শুধু সিলেটের সাথে হরিকেলকে অভিন্ন বলে মনে
করেন।
সমতট :
পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বঙ্গের প্রতিবেশী জনপদ হিসেবে ছিল সমতটের
অবস্থান। এ অঞ্চলটি ছিল আর্দ্র নিম্নভূমি। কেহ কেহ মনে করেন সমতট বর্তমান
কুমিল-র প্রাচীন নাম। আবার কেহ মনে করেন, কুমিল- ও নোয়াখালীাা অঞ্চল নিয়ে
সমতট গঠিত হয়েছিল। সাত শতক থেকে বারো শতক পর্যন্ত বর্তমান ত্রিপুরা জেলা
ছিল সমতটের অন্যতম অংশ। এক সময় এ জনপদের পশ্চিম সীমা চব্বিশ পরগনার খাড়ি
পরগনা পর্যন্ত বিস-ৃত ছিল। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার
মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রকূলবর্তী অঞ্চলকেই সম্ভবত বলা হতো সমতট। কুমিল- শহরের
১২া মাইল পশ্চিমে বড় কামতা নামক স্থানটি সাত শতকে এর রাজধানী ছিল।
বরেন্দ্র :
বরেন্দ্রী, বরেন্দ্র বা বরেন্দ্র ভূমি নামে প্রাচীন বাংলায় অপর একটি জনপদের
কথা জানা যায়। এটিও উত্তর বঙ্গের একটি জনপদ। বরেন্দ্র পুন্ড্রবর্ধন জনপদের
সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ছিল। জনপদের প্রধান শহর, মৌর্য ও গুপ্ত
আমলে প্রাদেশিক শাসনকর্তার কেন্দ্র পুন্ড্রনগরের অবস্থানও ছিল এই বরেন্দ্র
এলাকায়। তাই একে জনপদ বলা যায় না। কিন্তু এ নামে এক সময় সমগ্র এলাকা পরিচিত
হতো। তাই প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে একে জনপদের মর্যাদা দেওয়া হয়। একথা
নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছিল এ জনপদের
অবস্থান। বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলার অনেকটা অঞ্চল এবং সম্ভবত পাবনা
জেলা জুড়ে বরেন্দ্র অঞ্চল বিস-ৃত ছিল। তাম্রলিপ্ত : হরিকেলের উত্তরে অবসি'ত
ছিল তাম্রলিপ্ত জনপদ। বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুকই ছিল তাম্রলিপ্তের
প্রাণকেন্দ্র। সমুদ্র উপকূলবর্তী এ এলাকা ছিল খুব নিচু ও আর্দ্র। নৌ
চলাচলের জন্য জায়গাটি ছিল খুব উত্তম। প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত গুরুত্বপূর্ণ
নৌ-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। হুগলী ও রূপনারায়ণ নদের সঙ্গমস'ল
হতে ১২ মাইল দূরে রূপনারায়ণের তীরে এ বন্দরটি অবসি'ত ছিল। সাত শতক হতে ইহা
দণ্ডভুক্তি নামে পরিচিত হতে থাকে। আট শতকের পর হতেই তাম্রলিপ্ত বন্দরের
সমৃদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়।
চন্দ্রদ্বীপ :
উপরোক্ত জনপদগুলো ছাড়া আরও একটি ক্ষুদ্র জনপদের নাম প্রাচীন বাংলায় পাওয়া
যায়। এটা হলো চন্দ্রদ্বীপ। বর্তমান বরিশাল জেলাই ছিল চন্দ্রদ্বীপের মূল
ভূ-খণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র। এ প্রাচীন জনপদটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী
স্থানে অবসি'ত ছিল।
এছাড়া বৃহত্তর প্রাচীন বাংলায় দণ্ডভুক্তি, উত্তর রাঢ় (বর্তমান মুর্শিদাবাদ
জেলার পশ্চিমাংশ, সমগ্র বীরভূম জেলা এবং বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমা),
দক্ষিণ রাঢ় (বতর্মান বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলীর বহুলাংশ এবং হাওড়া জেলা),
বাংলা বা বাঙলা (সাধারণত খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালীর সুন্দর বনাঞ্চল)
ইত্যাদি নামেও শক্তিশালী জনপদ ছিল। এভাবে অতি প্রাচীনকাল হতে ছয়-সাত শতক
পর্যন্ত প্রাচীন বাংলার বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত ছিল। মূলত:,
ইহা ছিল রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিভাগ। সপ্তম শতকের গোড়ার দিকে শশাংক গৌড়ের
রাজা হয়ে মুর্শিদাবাদ হতে উৎকল (উত্তর উড়িষ্যা) পর্যন্ত সমগ্র এলাকাকে
সংঘবদ্ধ করেন। তারপর হতে বাংলা তিনটি জনপদ নামে পরিচিত হত। এগুলো
হলো-পুন্ড্রবর্ধন, গৌড় ও বঙ্গ। বাকী অন্যান্য জনপদগুলো এ তিনটির মধ্যে
বিলীন হয়ে যায়। বিভক্ত জনপদগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা পাল ও সেন
রাজাদের আমলেই অনেকটা পরিপূর্ণতা লাভ করে। শশাংশ এবং পাল রাজারা সমগ্র
পশ্চিম বঙ্গের রাজা হয়েও “রাঢ়াধিপতি’ বা “গৌড়েশ্বর’ বলেই পরিচয় দিতেন। ফলে
গৌড়’ নামটি পরিচিতি লাভ করে।
প্রাচীন বাংলার জনপদ হতে আমরা তখনকার বাংলার ভৌগোলিক অবয়ব, সীমারেখা,
রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারি।
প্রাচীন বাংলায় তখন কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। শক্তিশালী শাসকগণ তাঁদের
আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে একাধিক জনপদের শাসন ক্ষমতা লাভ করতেন। এভাবে
জনপদগুলো প্রাচীন বাংলায় প্রথম ভূখণ্ডগত ইউনিট বা প্রশাসনিক ইউনিট হিসাবে
ভূমিকা পালন করে পরবর্তীতে রাজনৈতিক ঐক্য গঠনে সহায়তা করেছিল।
এই ব্লগের লেখাসমূহ সরাসরি বোর্ড বই থেকে উদ্ধৃত এবং Creative Commons
Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License এর
আওতায় প্রকাশিত।
প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (খ্রিঃপূর্ব ৩২৬-১২০৪ খ্রিঃ)
পাল রাজাদের শাসনকাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে
ধারণা লাভ করা যায়। এর আগের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। এ সময়কালে কোনো
শাসক দীর্ঘদিন সমগ্র বাংলা জুড়ে শাসন করতে পারেননি। তাই বিচ্ছিন্নভাবেই
বাংলার রাজনৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটেছে। মৌর্য ও গুপ্ত শাসনের অবসানের পর এক
অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়। এরই মধ্য দিয়ে উত্থান ঘটে কিছু স্বাধীন
রাজ্যের। স্বাধীন রাজ্য উত্থানের যুগে উত্তর বাংলার রাজা শশাংক ছিলেন
সবচেয়ে শক্তিমান। তাঁর মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল বাংলায় কোন যোগ্য শাসক ছিলেন
না। ফলে রাজ্য জুড়ে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। প্রায় একশত বছর এ
অবস্থার মধ্যে কাটে। অতঃপর গোপাল নামে এক নেতা এ অরাজক অবস্থার অবসান ঘটান
এবং পাল বংশের প্রতিষ্ঠা করেন। বারো শতকের মাঝামাঝি পাল বংশের পতন ঘটে। পাল
শাসন যুগেই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য গড়ে উঠে।
এরপর দক্ষিণ ভারতের কর্ণাট থেকে আগত সেন বংশ পূর্ব বাংলায় রাজ্য স্থাপন
করে। প্রায় দুইশত বছর সেন শাসন অব্যাহত ছিল। তের শতকের প্রথম দশকে মুসলমান
শক্তির হাতে সেন রাজত্বের অবসান ঘটে। শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়- বাংলার
মধ্যযুগ।
প্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ ও শাসন-ব্যবস্থা
মৌর্য ও গুপ্ত যুগে বাংলা
গুপ্ত যুগের পূর্বে প্রাচীন বাংলার ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা করার তেমন কোনো
উপাদান পাওয়া যায়নি। কেননা তখনকার মানুষ আজকের মতো ইতিহাস লেখায় অভ্যস্ত
ছিল না। ভারতীয় এবং বিদেশি সাহিত্যে এ সময়কার বাংলা সম্পর্কে ইতস্তত ও
বিক্ষিপ্ত উক্তি হতে আমরা ইতিহাসের অল্পস্বল্প উপাদান পাই। এ সকল বিচ্ছিন্ন
ঘটনা জোড়াতালি দিয়ে সন-তারিখ ও প্রকৃত ঘটনা সম্বলিত ধারাবাহিক কোনো ইতিহাস
রচনা করা সম্ভব নয়। বস্তুত, খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭- ২৬ অব্দে গ্রীক বীর
আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় হতে প্রকৃত ইতিহাসের রূপ পরিগ্রহ করে।
গ্রীক লেখকদের কথায় তখন বাংলাদেশে ‘গঙ্গারিডই’ নামে এক শক্তিশালী রাজ্য
ছিল। গঙ্গা নদীর যে দুটি স্রোত এখন ভাগীরথী ও পদ্মা বলে পরিচিত-এ উভয়ের
মধ্যবর্তী অঞ্চলই ‘গঙ্গারিডই’ জাতির বাসস্থান ছিল। গ্রীক গ্রন্থকারগণ
গঙ্গারিডই ছাড়াও ‘প্রাসিঅয়’ নামে অপর এক জাতির উলে- করেছেন। তাদের রাজধানীর
নাম ছিল পালিবোথরাখ (পাটলিপুত্র)। গ্রীক লেখকদের বর্ণনার উপর নির্ভর করে
অনুমান করা যেতে পারে যে এ দু জাতি একই রাজবংশের নেতৃত্বে একসঙ্গে
আলেকজান্ডারের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেছিল। এও অনুমান করা যেতে পারে,
আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় বাংলার রাজা মগধাদি দেশ জয় করে পাঞ্জাব পর্যন্ত
স্বীয় রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। তিনি ছিলেন পাটলিপুত্রের নন্দবংশীয় কোনো
রাজা। এ সময় যে বাংলার রাজাই সমধিক শক্তিশালী ছিলেন প্রাচীন গ্রীক লেখকগণের
উক্তি থেকে তা নি:সন্দেহে প্রমাণিত হয়।
আলেকজান্ডারের ভারত ত্যাগের মাত্র দুই বছর পর ৩২১ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে মৌর্য
সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ভারতের এক বিশাল অঞ্চলের উপর মৌর্য বংশের
প্রভুত্ব স্থাপন করেন। উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় সম্রাট
অশোকের রাজত্বকালে (২৬৯-২৩২ খ্রিঃপূঃ)। অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে
পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন পুন্ড্রনগর ছিল এ প্রদেশের রাজধানী। উত্তর বঙ্গ
ছাড়াও মৌর্য শাসন কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদ), তাম্রলিপ্ত, (হুগলী) ও সমতট
(দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর শুঙ্গ ও পরে কন্ব বংশের আবির্ভাব ঘটে। এ যুগের
ইতিহাস জানার মতো যথেষ্ট উপাদান আমাদের কাছে নেই। ধারণা করা হয় তারা কিছু
ছোট অঞ্চলের উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিল। এরপর বেশ কটি বিদেশি শক্তি
ভারতবর্ষ আক্রমণ করে। এদের মধ্যে গ্রীক, শক, পহ্লব, কুষাণ প্রভৃতি উলে-
যোগ্য। তবে এ আক্রমণকারীরাখ বাংলা পর্যন্ত এসেছিল কি-না তা বলা যায় না।
গুপ্ত যুগ সম্পর্কে জানার মতো বেশ কিছু উপাদান ইতিহাসবিদদের হাতে রয়েছে। এ
থেকে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের শেষভাগ ও চতুর্থ শতকের প্রথম ভাগের ইতিহাস রচনা
সহজ হয়েছে। ভারতে গুপ্ত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় ৩২০ খ্রিস্টাব্দে। তখন
বাংলায় বেশ কিছু স্বাধীন রাজ্যের উত্থান ঘটে। এগুলোর মধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব
বাংলার সমতট রাজ্য ও পশ্চিম বাংলার পুষ্করণ রাজ্য উলে- যোগ্য। গুপ্ত সম্রাট
প্রথম চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালেই উত্তর বঙ্গের কিছু অংশ গুপ্তখ
সাম্রাজ্যের অধিকারে আসে। সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকালে সমগ্র বাংলা জয় করা
হলেও সমতট একটি করদ রাজ্য ছিল। সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকাল হতে ষষ্ঠ শতকের
মাঝামাঝি পর্যন্ত উত্তরবঙ্গ গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনস্থ একটি ‘প্রদেশ’ বা
‘ভুক্তি’ হিসেবে পরিগণিত হতো। মৌর্যদের মত এদেশে গুপ্তদের রাজধানী ছিল
মহাস্থানগড়ের পুন্ড্রনগর।
গুপ্ত পরবর্তী বাংলা
পাঁচ শতকে দুর্ধর্ষ পাহাড়ি জাতি হুন ও ষষ্ঠ শতকে মালবের যশোবর্মণের
আক্রমণের ফলে ষষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধেই গুপ্ত শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে। বিশাল
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর সারা উত্তর ভারতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন
রাজবংশের উদ্ভব হয়। এভাবে গুপ্তদের পর সমগ্র উত্তর ভারতে রাজনৈতিক অস্থিরতা
দেখা দেয়। সে সুযোগে বাংলাদেশে দুটি স্বাধীন রাজ্যের সৃষ্টি হয়। এর একটি
হলো বঙ্গ। এর অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম-বাংলার দক্ষিণাঞ্চলে।
দ্বিতীয় রাজ্যের নাম গৌড়। এর অবস্থান ছিল বাংলার পশ্চিম ও উত্তর বাংলা
নিয়ে।
স্বাধীন বঙ্গ রাজ্য
গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে বঙ্গ জনপদে একটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব
ঘটে। তাম্র শাসন (তামার পাতে খোদাই করা রাজার বিভিন্ন ঘোষণা বা নির্দেশ)
থেকে জানা যায় যে, গোচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব নামে তিনজন রাজা
স্বাধীন বঙ্গরাজ্য শাসন করতেন। এঁরা সবাই ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ
করেছিলেন। তাঁদের রাজত্বকাল ছিল ৫২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬০০ খ্রিস্টাব্দের
মধ্যে।
কোন্ সময়ে এবং কীভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী বঙ্গ রাজ্যের পতন হয়েছিল তা বলা
যায় না। ধারণা করা হয়, দাক্ষিণাত্যের চালুক্য বংশের রাজা কীর্তিবর্মনের
হাতে স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের পতন ঘটেছিল। ভিন্ন মত যাঁরা পোষণ করেন তাঁরা
বলেন, স্বাধীন গৌড় রাজ্যের উত্থান ঘটলে বঙ্গ রাজ্যের পতন ঘটে। আবার স্বাধীন
বঙ্গ রাজ্যের পতনের পেছনে কিছু সামন্ত রাজার উত্থানকেও দায়ী করা হয়। কারণ,
সাত শতকের পূর্বেই দক্ষিণ বাংলার সমতট রাজ্যে ভদ্র, খড়গ, রাঢ় প্রভৃতি
বংশের স্বাধীন ও সামন্ত রাজাদের উত্থান ঘটেছিল।
স্বাধীন গৌড় রাজ্য
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর ছয় শতকে ‘পরবর্তী গুপ্ত বংশ’ বলে পরিচিত গুপ্ত
উপাধিধারী রাজাগণ উত্তর বাংলা, পশ্চিম বাংলার উত্তরাংশ ও মগধে ক্ষমতা
বিস্তার করেছিলেন। ছয় শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ অঞ্চলই গৌড় জনপদ নামে পরিচিতি
লাভ করে। মৌখরী ও পরবর্তী গুপ্তবংশীয় রাজাদের মধ্যে প্রায় পঞ্চাশ বছর
পুরুষানুক্রমিক সংঘর্ষ এবং উত্তর থেকে তিব্বতীয় ও দাক্ষিণাত্য থেকে
চালুক্যরাজগণের ক্রমাগত আক্রমণের ফলে বাংলায় গুপ্তবংশীয় রাজাগণ দুর্বল হয়ে
পড়েন। এ অবস্থার পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে শশাংক নামে জনৈক সামন্ত সপ্তম শতকের
গোড়ার দিকে গৌড় অঞ্চলে ক্ষমতা দখন করেন এবং স্বাধীন গৌড় রাজ্যের প্রতিষ্ঠা
করেন।
শশাংক : শশাংকের পরিচয়, তাঁর উত্থান ও জীবন-কাহিনী আজও পণ্ডিতদের নিকট
পরিষ্কার নয়। কেননা তাঁর আমলের ইতিহাসের যে সমস্ত উপাদান পাওয়া গেছে তাতে
বহু বিপরীতমুখী বর্ণনা রয়েছে। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসককে
বলা হতো ‘মহাসামন্ত’। ধারণা করা হয় শশাংক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেনগুপ্তের
একজন ‘মহাসামন্ত’ এবং তাঁর পুত্র অথবা ভ্রাতুষ্পুত্র।
শশাংক ৬০৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বেই রাজ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজধানী
ছিল কর্ণসুবর্ণ। তিনি গৌড়ে তাঁর অধিকার স্থাপন করে প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজ্য
বিস্তার শুরু করেন। তিনি দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুর) রাজ্য, উড়িষ্যার উৎকল
(উত্তর উড়িষ্যা) ও কঙ্গোদ (দক্ষিণ উড়িষ্যা) রাজ্য এবং বিহারের মগধ রাজ্য জয়
করে তাঁর রাজ্যসীমা বৃদ্ধি করেন। পশ্চিমে তাঁর রাজ্য বারাণসী পর্যন্ত
বিস্তৃত ছিল। কামরুপের (আসাম) রাজাও শশাংকের হাতে পরাজিত হন। এরপর তিনি
পশ্চিম সীমান্তের দিকে মনোযোগ দেন। উত্তর ভারতে এ সময় দুজন শক্তিশালী রাজা
ছিলেন। একটি পুষ্যভূতি রাজবংশের অধীনে থানেশ্বর এবং অন্যটি মৌখরী রাজবংশের
অধীনে কান্যকুব্জ। পশ্চিম দিক থেকে কনৌজের মৌখরী শক্তি বাংলা অধিকারের জন্য
বার বার চেষ্টা করছিল। তদুপরি সমসাময়িক সময়ে থানেশ্বরের রাজা
প্রভাকরবর্ধনের কন্যা রাজ্যশ্রীর সঙ্গে কনৌজের মৌখরী রাজা গ্রহবর্মণের বিয়ে
হলে কনৌজ-থানেশ্বর জোট গড়ে উঠে। এ জোটের ফলে বাংলার নিরাপত্তা বিশেষভাবে
বিপন্ন হয়ে পড়ে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে শশাংকও কূটনৈতিক সূত্রে মালবরাজ
দেবগুপ্তের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে স্বীয় শক্তি বৃদ্ধি করেন।
পরাক্রান্ত থানেশ্বররাজ প্রভাকরবর্ধনের অকস্মাৎ মৃত্যু হলে তাঁর জামাতা
কনৌজের গ্রহবর্মণ সিংহাসনে বসেন। মালবরাজ দেবগুপ্ত মৌখরিরাজ গ্রহবর্মণকে
পরাজিত করেন। তাঁর মহিষী রাজ্যশ্রীকে বন্দী করা হয়। দেবগুপ্ত এরপর
থানেশ্বরের দিকে অগ্রসর হন। থানেশ্বরের রাজা তখন রাজ্যবর্ধন। পথিমধ্যে
দেবগুপ্ত রাজ্যবর্ধনের হস্তে পরাজিত ও নিহত হন। কিন্তু কনৌজের উপর নিজ
প্রভুত্ব বিস্তার ও ভগ্নী রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার করার আগেই তিনি শশাংকর হাতে
মৃত্যুবরণ করেন।
রাজ্যবর্ধনের মৃত্যু হলে হর্ষবর্ধন কনৌজ ও থানেশ্বরের সিংহাসনে আরোহন করেন।
তিনি কাল বিলম্ব না করে রাজ্যশ্রীকে উদ্ধার ও প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য
শশাংকের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেন। এ সময় কামরূপের ভাস্করবর্মা তাঁর সঙ্গে
মিত্রতাবদ্ধ হন। কিন্তু এ সংঘর্ষের ফলাফল বা আদৌ কোনো সংঘর্ষ হয়েছিল কি-না
সে বিষয়ে সঠিকভাবে জানা যায় না। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের কিছু আগে শশাংক
মৃত্যুবরণ করেন।
শশাংক শৈব ধর্মের উপাসক ছিলেন। হিউয়েন-সাং তাঁকে বৌদ্ধ ধর্ম বিদ্বেষী বলে
আখ্যায়িত করেছেন। তবে এ ব্যাপারে তেমন কোনো জোরালো প্রমাণ আজও পাওয়া যায়নি।
সাত শতকে বাংলার ইতিহাসে শশাংক একটি বিশিষ্ট নাম। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে
তিনিই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম শাসক।
মাৎসান্যায় ও পাল বংশ (৭৫০ খ্রিঃ - ১১৬১ খ্রিঃ)
শশাংকের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে এক দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারময় যুগের সূচনা
হয়। দীর্ঘদিন বাংলায় কোন যোগ্য শাসক ছিলেন না। ফলে, রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও
অরাজকতা দেখা দেয়। একদিকে হর্ষবর্ধন ও ভাস্করবর্মণের হাতে গৌড় রাজ্য ছিন্ন
ভিন্ন হয়ে যায়, অন্যদিকে ভূ-স্বামীরা প্রত্যেকেই বাংলার রাজা হওয়ার কল্পনায়
একে অন্যের সাথে সংঘাতে মেতে উঠে। কেন্দ্রীয় শাসন শক্ত হাতে ধরার মতো তখন
কেউ ছিলেন না। এ অরাজকতার সময়কালকে পাল তাম্রশাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে
‘মাৎসান্যায়’ বলে। পুকুরে বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে গিলে ফেলার মতো বিশৃঙ্খল
পরিস্থিতিকে বলে ‘মাৎসান্যায়’। বাংলার সবল অধিপতিরা এমনি করে ছোট ছোট
অঞ্চলগুলোকে গ্রাস করছিল। এ অরাজকতার যুগ চলে একশত বছরব্যাপী। আট শতকের
মাঝমাঝি এ অরাজকতার অবসান ঘটে পাল রাজত্বের উত্থানের মধ্য দিয়ে।
দীর্ঘদিনের অরাজকতায় বাংলার মানুষের মন বিষিয়ে গিয়েছিল। এ চরম দুঃখ-দুর্দশা
হতে মুক্তি লাভের জন্য দেশের প্রবীণ নেতাগণ স্থির করলেন যে তারা পরস্পর
বিবাদ-বিসম্বাদ ভুলে একজনকে রাজপদে নির্বাচিত করবেন এবং সকলেই স্বেচ্ছায়
তাঁর প্রভুত্ব স্বীকার করবেন। দেশের জনসাধারণও এ মত সানন্দে গ্রহণ করে। এর
ফলে গোপাল নামক এক ব্যক্তি রাজপদে নির্বাচিত হলেন। পরবর্তী শাসক ধর্মপালের
রাজত্বকালে উৎকীর্ণ খালিমপুরের তাম্রলিপি হতে গোপালের এ নির্বাচনের কাহিনী
পাওয়া যায়। গোপালের সিংহাসন আরোহণ নিয়ে তিব্বতের ঐতিহাসিক লামা তারনাথ
অবশ্য এক রূপকথার অবতারণা করেছেন। তাঁর কাহিনীর সারকথা : দেশে দীর্ঘদিন
যাবৎ অরাজকতার ফলে জনগণের দু:খ-কষ্টের আর সীমা ছিল না। দেশের শীর্ষ স্থানীয়
ব্যক্তিরা একমত হয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একজন ‘রাজা’ নির্বাচিত
করেন। কিন্তু ‘নির্বাচিত রাজা’ রাতে এক কুৎসিত নাগ রাক্ষসী কর্তৃক নিহত হন।
এরপর প্রতি রাতেই একজন করে ‘নির্বাচিত রাজা’ নিহত হতে থাকেন। এভাবে বেশ
কিছু বছর কেটে গেল। অবশেষে একদিন চুন্ডাদেবীর এক ভক্ত এক বাড়িতে এসে দেখে
সে বাড়ির সকলেরই মন খুব খারাপ। কারণ, ঐদিন ‘নির্বাচিত’ রাজা হবার ভার পড়েছে
ঐ বাড়িরই এক ছেলের উপর। আগন্তুক ঐ ছেলের পরিবর্তে নিজে রাজা হতে রাজি হন।
পরবর্তী সকালে তিনি রাজা ‘নির্বাচিত’ হন। সে রাত্রে নাগ রাক্ষুসী এলে তিনি
চুন্ডাদেবীর মহিমাযুক্ত লাঠির আঘাতে রাক্ষুসীকে মেরে ফেলেন। পরের দিন তাকে
জীবিত দেখে সকলেই আশ্চর্য হয়। পরপর সাতদিন তিনি এভাবে রাজা ‘নির্বাচিত’ হন।
অবশেষে তাঁর অদ্ভুত যোগ্যতার জন্য জনগণ তাঁকে স্থায়ীভাবে রাজা রূপে
‘নির্বাচিত’ করে।
গোপালের পূর্ব জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। পাল বংশের পরিচয় ও
আদি বাসস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট কিছু জানা যায় না। গোপালের পিতার নাম বপ্যট।
তিনি ছিলেন ‘শত্রু ধ্বংসকারী’। পিতামহ ছিলেন দয়িতবিষ্ণু। তাদের নামের আগে
কোন রাজকীয় উপাধি দেখা যায়নি। এতে মনে করা হয়, তারা সাধারণ ব্যক্তিই ছিলেন।
দয়িতবিষ্ণু ‘সর্ববিদ্যা বিশুদ্ধ’ ছিলেন। এ থেকে মনে হয়, গোপালও পিতার মতো
সুনিপুণ যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গোপালের সিংহাসনে আরোহণের মধ্য দিয়ে
বাংলায় পাল রাজত্বের শুরু হয়। পাল বংশের রাজাগণ একটানা চারশত বছর এদেশ শাসন
করেন। এত দীর্ঘ সময় আর কোন রাজবংশ এদেশ শাসন করেনি।
গোপাল সিংহাসনে আরোহণ করে রাজ্য বিস্তারে মনোযোগ দেন। তিনি বাংলার উত্তর
এবং পূর্ব অংশের প্রায় সমগ্র অঞ্চলই রাজ্যভুক্ত করেন। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা
গোপালের শাসনের বাইরে থেকে যায়। অনেকের মতে গোপাল ২৭ বৎসর শাসন করেছিলেন।
কিন্তু আধুনিক গবেষকগণ মনে করেন, তিনি ৭৫৬ থেকে ৭৮১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত
দেশ শাসন করেন।
গোপালের মৃত্যুর পর ধর্মপাল (৭৮১-৮২১ খ্রিঃ) বাংলার সিংহাসনে বসেন। পাল
রাজাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। বাংলা ও বিহারব্যাপী তাঁর শাসন
প্রতিষ্ঠিত ছিল। উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এ সময়ে তিনটি রাজবংশের
মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। একটি বাংলার পাল, অন্যটি রাজপুতনার
গুর্জরপ্রতিহার ও তৃতীয়টি দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূট। ইতিহাসে এ যুদ্ধ
‘ত্রি-শক্তির সংঘর্ষ’ বলে পরিচিত। আট শতকের শেষ দিকে এ যুদ্ধ শুরু হয়।
প্রথম যুদ্ধ হয় ধর্মপাল ও প্রতিহার বংশের রাজা বৎসরাজার মধ্যে। এ যুদ্ধে
ধর্মপাল পরাজিত হন। তবুও ধর্মপাল এ সময় বাংলার বাইরে বেশকিছু অঞ্চল জয়
করেছিলেন। তিনি বারাণসী ও প্রয়াগ জয় করে গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী অঞ্চল
পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেন। ত্রি-শক্তির সংঘর্ষের প্রথম দিকে ধর্মপাল
পরাজিত হলেও তাঁর বিশেষ কোন ক্ষতি হয়নি। কারণ, বিজয়ের পর রাষ্ট্রকূটরাজ
দাক্ষিণাত্যে ফিরে যান। এ সুযোগে ধর্মপাল কনৌজ অধিকার করেন। কিন্তু অল্প
সময়ের মধ্যেই প্রতিহাররাজ দ্বিতীয় নাগভট্ট কনৌজ দখল করেন। ফলে, ধর্মপালের
সাথে তাঁর যুদ্ধ বাঁধে। এ যুদ্ধে ধর্মপাল পরাজিত হন। এ পরাজয়েও ধর্মপালের
কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ, পূর্বের মতো রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় গোবিন্দ উত্তর
ভারতে আসেন এবং দ্বিতীয় নাগভট্টকে পরাজিত করেন। প্রতিহার রাজের পরাজয়ের পর
ধর্মপালও তৃতীয় গোবিন্দের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। অতঃপর রাষ্ট্রকূটরাজ তাঁর
দেশে ফিরে গেলে ধর্মপাল পুনরায় উত্তর ভারতে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ লাভ
করেন। কেহ কেহ মনে করেন, ধর্মপাল নেপালও জয় করেছিলেন। ধর্মপাল প্রায় ৪০
বৎসর (৭৮১-৮২১ খ্রিঃ) রাজত্ব করেন।
সোমপুর বিহার, পাহাড়পুর, নওগা
পিতার মতো ধর্মপাল বৌদ্ধ ছিলেন। পাল রাজাদের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ সার্বভৌম
উপাধি পরমেশ্বর, পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ ধারণ করেছিলেন। ভাগলপুরের ২৪
মাইল পূর্বে তিনি একটি বৌদ্ধ বিহার বা মঠ নির্মাণ করেন। বিক্রমশীল তাঁর
দ্বিতীয় নাম বা উপাধি অনুসারে এটি ‘বিক্রমশীল বিহার’ নামে খ্যাত ছিল।
নালন্দার মতো বিক্রমশীল বিহারও ভারতবর্ষের সর্বত্র ও ভারতবর্ষের বাইরে
প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। নবম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত এটি সমগ্র
ভারতবর্ষের একটি বিখ্যাত বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তিব্বতের
বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু এখানে অধ্যয়ন করতে আসতেন এবং এখানকার অনেক প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ
আচার্য তিব্বতে বিশুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছিলেন। নাটোর জেলার পাহাড়পুর
নামক স্থানেও ধর্মপাল এক বিশাল বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। ইহা সোমপুর বিহার
নামে পরিচিত। এই স্থাপত্য কর্মটি জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বসভ্যতার
নিদর্শন হিসেবে (ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ) স্বীকৃত হয়েছে। এর ন্যায় প্রকাণ্ড
বিহার ভারতবর্ষের আর কোথাও এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। ওদন্তপুরেও (বিহার)
তিনি সম্ভবত একটি বিহার নির্মাণ করেন। তারনাথের মতে, ধর্মপাল বৌদ্ধধর্ম
শিক্ষার জন্য ৫০টি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রাজা হিসেবে সকল ধর্মাবলম্বী প্রজার প্রতি সমান পৃষ্ঠপোষকতা পাল যুগের একটি
বৈশিষ্ট্য। তাই নিজে বৌদ্ধ হলেও অন্যান্য ধর্মের প্রতি ধর্মপালের কোনো
বিদ্বেষ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, রাজার ব্যক্তিগত ধর্মের সহিত রাজ্য
শাসনের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই তিনি শাস্ত্রের নিয়ম মেনে চলতেন এবং প্রতি
ধর্মের লোক যাতে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারে তার প্রতি খেয়াল রাখতেন।
নারায়নের একটি হিন্দু মন্দিরের জন্য তিনি করমুক্ত ভূমি দান করেছিলেন। তিনি
যাদেরকে ভূমি দান করেছিলেন তাদের অধিকাংশই ছিল ব্রাহ্মণ। ধর্মপালের
প্রধানমন্ত্রী গর্গ ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ। তাঁর বংশধরেরা বহুদিন ধরে পাল
রাজাদের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে খ্যাতিমান সর্বশ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে ধর্মপাল
অন্যতম। অর্ধ শতাব্দী পূর্বে যে দেশ অরাজকতা ও অত্যাচারের লীলাভূমি ছিল,
তাঁর নেতৃত্বে সে দেশ সহসা প্রচণ্ড শক্তিশালী হয়ে উত্তর ভারতে প্রভুত্ব
প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।
ধর্মপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দেবপাল (৮২১ খ্রিঃ-৮৬১ খ্রিঃ) সিংহাসনে
বসেন। তিনি পিতার যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন। পিতার ন্যায় তিনিও বাংলার
রাজ্যসীমা বিস্তারে সফল হন। দেবপাল উত্তর ভারতে প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট
রাজাদের বিরুদ্ধে সফল অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। উত্তর ভারতের বিশাল অঞ্চল
তাঁর অধিকারে এসেছিল। উড়িষ্যা ও কামরূপের উপরও তিনি আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম
হয়েছিলেন। মোট কথা, তাঁর সময়েই পাল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ
করেছিল। দেবপাল বৌদ্ধ ধর্মের একজন বড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। মগধের বৌদ্ধ মঠগুলোর
তিনিই সংস্কার সাধন করেন। তিনি নালন্দায় কয়েকটি মঠ এবং বুদ্ধগয়ায় এক বিরাট
মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। মুঙ্গেরে তিনি নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। জাভা,
সুমাত্রা ও মালয়ের শৈলেন্দ্র বংশের মহারাজ বালপুত্রদেবকে নালন্দায় একটি মঠ
প্রতিষ্ঠার অনুমতি দান করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, এ মঠের ব্যয় নির্বাহের
জন্য পাঁচটি গ্রামও প্রদান করা হয়। এ ঘটনা হতে বাংলা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার
দ্বীপপুঞ্জের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়।
দেবপাল বিদ্যা ও বিদ্বানের প্রতি অতিশয় শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বিভিন্ন দেশের
বৌদ্ধ পণ্ডিতগণ তাঁর রাজসভা অলংকৃত করতেন। দেবপালের পৃষ্ঠপোষকতায় নালন্দা
বিশ্ববিদ্যালয় তখন সমগ্র এশিয়ায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রধান প্রাণকেন্দ্র হয়ে
উঠেছিল। ইন্দ্রগুপ্ত নামক জনৈক বৌদ্ধ শাস্ত্রে পারদর্শী ব্রাহ্মণকে তিনি
নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বা অধ্যক্ষ নিযুক্ত করেছিলেন। এ নালন্দা
বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই তাঁর শাসন আমলে উত্তর-ভারতে প্রায় হারিয়ে
যাওয়া বৌদ্ধধর্ম পুনরায় সজিব হয়ে উঠে।
দেবপালের মৃত্যুর পর থেকে পাল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর
কয়েকজন দুর্বলচেতা ও অকর্মন্য উত্তরাধিকারী সিংহাসনে বসেন। তাঁরা পাল
সাম্রাজ্যের গৌরব ও শক্তি অব্যাহত রাখতে পারেননি। ফলে পাল সাম্রাজ্য ক্রমেই
পতনের দিকে ধাবিত হয়। দেবপালের পুত্র প্রথম বিগ্রহপাল থেকে দ্বিতীয়
বিগ্রহপালের রাজত্বকাল ৮৬১ হতে ৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। প্রথম বিগ্রহপালের
পুত্র নারায়ণপাল (৮৬৬-৯২০ খিস্টাব্দ) দীর্ঘকাল রাজত্ব করেন। তিনি একজন
দুর্বল উদ্যমহীন শাসক ছিলেন। ফলে, তাঁর রাজত্বকালে পাল সাম্রাজ্যের সীমা
ছোট হতে থাকে। নারায়ণ পালের পর একে একে পাল সিংহাসনে বসেন রাজ্যপাল,
দ্বিতীয় গোপাল ও দ্বিতীয় বিগ্রহপাল। এঁরা আনুমানিক ৯২০ হতে ৯৯৫ খিস্টাব্দ
পর্যন্ত রাজত্ব করেন। দ্বিতীয় বিগ্রহপালের সময় পাল রাজাদের শাসন ক্ষমতা
কেবল গৌড় ও তার আশপাশেই সীমাবদ্ধ ছিল। এসব দুর্বল রাজার সময়ে উত্তর ভারতের
চন্দেল-ও কলচুরি বংশের রাজাদের আক্রমণে পাল সাম্রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
ফলে, এ সময়ে পাল সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে উত্তর-পশ্চিম বাংলার অংশ বিশেষে
কম্বোজ রাজবংশের উত্থান ঘটে।
এভাবে পাল সাম্রাজ্য যখন ধ্বংসের মুখে, তখন আশার আলো নিয়ে এগিয়ে এলেন
দ্বিতীয় বিগ্রহপালের সুযোগ্য পুত্র প্রথম মহীপাল (আঃ ৯৯৫-১০৪৩ খ্রিঃ)। তাঁর
জীবনের সবচেয়ে উলে- যোগ্য কীর্তি হলো কম্বোজ জাতির বিতাড়ন এবংখ পূর্ব বঙ্গ
অধিকার করে পাল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এরপর তিনি রাজ্য বিজয়ে মনোযোগ
দেন। তাঁর সাম্রাজ্য পূর্ব বঙ্গ হতে বারানসী এবং মিথিলা পর্যন্ত বিস্তার
লাভ করেছিল। সে সময়ে ভারতের দুই প্রবল রাজশক্তি তামিলরাজ রাজেন্দ্র চোল এবং
চেদীরাজ গাঙ্গেয়দেবের আক্রমণ হতে তিনি রাজ্যের অধিকাংশ স্থানে স্বীয়
আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মহীপাল বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন। মনে প্রাণে তিনি ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের উদার
পৃষ্ঠপোষক। পুরাতন কীর্তি রক্ষায় তিনি যত্নবান ছিলেন। তিনি নালন্দায় এক
বিশাল বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করেন। বারানসীতেও তাঁর আমলে কয়েকটি বৌদ্ধ
মন্দির নির্মাণ করা হয়।
মহিপাল জনকল্যাণকর কার্যের দিকেও মনোযোগী ছিলেন। বাংলার অনেক দীঘি ও নগরী
এখনও তাঁর নামের সহিত জড়িত হয়ে আছে। তিনি অসংখ্য শহর প্রতিষ্ঠা ও দীঘি খনন
করেন। শহরগুলো হলো রংপুর জেলার মাহীগঞ্জ, বগুড়া জেলার মহীপুর, দিনাজপুর
জেলার মাহীসন্তোষ ও মুর্শিদাবাদ জেলার মহীপাল নগরী। আর দীঘিগুলোর মধ্যে
দিনাজপুরের মহীপাল দীঘি ও মুর্শিদাবাদের মহীপালের সাগর দীঘি বিখ্যাত।
সম্ভবত জনহিতকর কাজের মাধ্যমেই মহীপাল এ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
মহীপালের পঞ্চাশ বছরের রাজত্বকালে পাল বংশের সৌভাগ্য রবি আবার উদিত হয়েছিল।
এ জন্যই ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। পাল সাম্রাজ্যের দ্রুত
অবনতির যুগে প্রথম মহীপালের আবির্ভাব না ঘটলে এ সাম্রাজ্যের রাজত্বকালের
সময়কাল নিঃসন্দেহে আরও সঙ্কুচিত হতো।
কিন্তু মহীপাল কোন যোগ্য উত্তরসূরি রেখে যেতে পারেননি। তাই তাঁর মৃত্যুর
সঙ্গে সঙ্গে সাম্রাজ্য ভেঙে যেতে শুরু করে। প্রথম মহীপালের পর তাঁর পুত্র
ন্যায়পাল (আ: ১০৪৩-১০৫৮ খ্রিঃ) ও পৌত্র তৃতীয় বিগ্রহপাল (আ: ১০৫৮- ১০৭৫
খ্রিঃ) পাল সিংহাসনে বসেন। এ দুর্বল রাজাদের সময় কলচুরি রাজা, কর্ণাটের
চালুক্য-রাজ, উড়িষ্যা ও কামরুপের রাজা বাংলা আক্রমণ করেন। সুদীর্ঘকাল ধরে
একের পর এক বিদেশি আক্রমণ মোকাবেলা করতে গিয়ে পাল সাম্রাজ্য যখন বিপর্যস্ত,
তখন দেশের অভ্যন্তরেও বিরোধ ও অনৈক্য দেখা দেয়। এরই সুযোগে বাংলার বিভিন্ন
অংশে ছোট ছোট স্বাধীন রাজ্যের সৃষ্টি হয়। বাংলার বাইরে বিহার পাল রাজাদের
হাতছাড়া হতে থাকে। এভাবে তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে বাংলার পাল
সাম্রাজ্য বহু স্বাধীন খণ্ড খণ্ড অংশে বিভক্ত হয়ে যায়।
এরপর পাল সিংহাসনে বসেন তৃতীয় বিগ্রহপালের পুত্র দ্বিতীয় মহীপাল। তাঁর সময়
পাল রাজত্বের দুর্যোগ আরও ঘনীভূত হয়। এ সময় উত্তর বঙ্গের বরেন্দ্র অঞ্চলের
সামন্তবর্গ প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এ বিদ্রোহ ‘কৈবর্ত
বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন কৈবর্ত নায়ক দিব্যোক বা
দিব্য। তিনি দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে বরেন্দ্র দখল করে নেন এবং নিজ শাসন
প্রতিষ্ঠা করেন।
বরেন্দ্র অঞ্চল যখন কৈবর্ত্যদের দখলে তখন পাল সিংহাসনে আরোহণ করেন দ্বিতীয়
মহীপালের ছোট ভাই দ্বিতীয় শূরপাল (আ: ১০৮০-১০৮২ খ্রিঃ)। অতঃপর তাঁর কনিষ্ঠ
ভ্রাতা রামপাল (খ্রিঃ ১০৮২-১১২৪ খ্রি) সিংহাসনে বসেন। তিনিই ছিলেন পাল
বংশের সর্বশেষ সফল শাসক। প্রাচীন বাংলার কবি সন্ধাকর নন্দী রচিত ‘রামচরিত’
হতে রামপালের জীবন কথা জানা যায়। রামপাল রাজ্যভার গ্রহণ করেই বরেন্দ্র
উদ্ধার করতে সচেষ্ট হন। এ বিষয়ে রামপালকে সৈন্য, অস্ত্র আর অর্থ দিয়ে
সাহায্যে এগিয়ে আসেন রাষ্ট্রকূট, মগধ, রাঢ় দেশসহ চৌদ্দটি অঞ্চলের রাজা।
যুদ্ধে কৈবর্তরাজ ভীম পরাজিত ও নিহত হন। এরপর তিনি বর্তমান মালদহের
কাছাকাছি ‘রামাবতি’ নামে নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। পরবর্তী পাল রাজাদের
শাসনামলে রামাবতিই সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। পিতৃভূমি বরেন্দ্রে কর্তৃত্ব
প্রতিষ্ঠার পর সাম্রাজ্যের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি মগধ, উড়িষ্যা
ও কামরূপের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
পাল বংশের দুর্ভাগ্য রামপালের পরবর্তী শাসকগণ ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল। ফলে
তাঁদের পক্ষে পালবংশের হাল শক্ত হাতে ধরা সম্ভব ছিল না। রামপালের পর
কুমারপাল (আঃ ১১২৪-১১২৯খ্রিঃ), তৃতীয় গোপাল (১১২৯-১১৪৩ খ্রিঃ) ও মদনপাল (আঃ
১১৪৩-১১৬১ খ্রিঃ) একে একে পাল সিংহাসনে বসেন। এ সময় যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই
থাকত। অবশেষে দ্বাদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে বিজয় সেন পাল সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি
ঘটিয়ে বাংলায় সেন বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার স্বাধীন রাজ্য
পাল যুগের বেশির ভাগ সময়েই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা স্বাধীন ছিল। তখন এ অঞ্চলটি ছিল বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি থেকে বেশ কিছু রাজবংশের রাজারা কখনো পাল রাজাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনভাবে তাদের এলাকা শাসন করতেন, আবার কখনো পাল রাজাদের অধীনতা স্বীকার করে চলতেন।
খড়গ বংশ :
সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মগধ ও গৌড়ে পরবর্তী গুপ্তবংশীয় রাজাগণ প্রভুত্ব স্থাপন করেন। এ সময় খড়গ বংশের রাজারা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্যের সৃষ্টি করেন। তাঁদের রাজধানীর নাম ছিল কর্মান্ত বাসক। কুমিল- জেলার বড় কামতার প্রাচীন নামই সম্ভবত এ কর্মান্ত বাসক। খড়গদের অধিকার ত্রিপুরা ও নোয়াখালী অঞ্চলের উপর বিস্তৃত ছিল।
দেববংশ :
খড়গ বংশের শাসনের পর একই অঞ্চলে অষ্টম শতকের শুরুতে দেব বংশের উত্থান ঘটে। এ বংশের চারজন রাজার নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন শ্রীশান্তিদেব, শ্রীবীরদেব, শ্রীআনন্দদেব ও শ্রীভবদেব। দেব রাজারা নিজেদের খুব শক্তিধর মনে করতেন। তাই তাঁরা তাদের নামের সাথে যুক্ত করতেন বড় বড় উপাধি। যেমন- পরম সৌগত, পরম ভট্টারক, পরমেশ্বর মহারাজাধিরাজ ইত্যাদি। তাঁদের রাজধানী ছিল দেবপর্বতে। কুমিল-র নিকটা ময়নামতির কাছে ছিল এ দেবপর্বত। দেবদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল সমগ্র সমতট অঞ্চলে। আনুমানিক ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেব রাজারা শাসন করেন।
কান্তিদেবের রাজ্য :
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার হরিকেল জনপদে নবম শতকে একটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এ রাজ্যের রাজা ছিলেন কান্তিদেব। দেব রাজবংশের সঙ্গে কান্তিদেবের কোনো সম্পর্ক ছিল কি-না তা জানা যায় না। তাঁর পিতা ছিলেন ধনদত্ত ও পিতামহ ভদ্রদত্ত। বর্তমান সিলেট কান্তিদেবের রাজ্যভুক্ত ছিল। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল বর্ধমানপুর। বর্তমানে এ নামে কোনো অঞ্চলের অস্তিত্ব নেই। এ সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চন্দ্র বংশ বলে পরিচিত নতুন এক শক্তির উদয় হয়। কান্তিদেবের গড়া রাজ্যের পতন হয় এ চন্দ্র বংশের হাতে।
চন্দ্রবংশ :
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন রাজবংশ ছিল চন্দ্র বংশ। দশম শতকের শুরু হতে একাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেড়শত বছর এ বংশের রাজারা শাসন করেন। চন্দ্রবংশের প্রথম নৃপতি পূর্ণচন্দ্র ও তৎপুত্র সুবর্ণচন্দ্র সম্ভবত রোহিতগিরির ভূ-স্বামী ছিলেন। সুবর্ণচন্দ্রের পুত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্রই এ বংশের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘মহারাজাধিরাজ’। ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা), বঙ্গ ও সমতট অর্থাৎ সমগ্র পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। লালমাই পাহাড় ছিল চন্দ্র রাজাদের মূল কেন্দ্র। এ পাহাড় প্রাচীনকালে রোহিতগিরি নামে পরিচিত ছিল। আনুমানিক ত্রিশ বছরকাল (৯০০-৯৩০ খ্রি:) তিনি রাজত্ব করেন।
ত্রৈলোক্যচন্দ্রের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর পুত্র শ্রীচন্দ্র। তাঁহার শাসনামলে চন্দ্র বংশের প্রতিপত্তি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়। তিনি নিঃসন্দেহে বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। তিনি ‘পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। তাঁর রাজ্য দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ছাড়াও উত্তর-পূর্ব কামরূপ ও উত্তরে গৌড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তিনি তাঁর রাজধানী গড়ে তোলেন। শ্রীচন্দ্র প্রায় ৪৫ বছর (আ: ৯৩০-৯৭৫ খ্রি:) শৌর্যবীর্যের সহিত রাজত্ব করেন।
শ্রীচন্দ্রের পুত্র কল্যাণচন্দ্র (আ: ৯৭৫-১০০০ খ্রি:) ও পৌত্র লডহচন্দ্র (আ: ১০০০-১০২০ খ্রি:) চন্দ্র বংশের গৌরব অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। লডহচন্দ্রের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন শেষ চন্দ্র রাজা। তাঁর রাজত্বকালে চোলরাজ রাজেন্দ্র চোল ও কলচুরিরাজ কর্ণ বঙ্গ আক্রমণ করেন। এই দুই বৈদেশিক আক্রমণ চন্দ্র রাজার ক্ষমতা হ্রাস করে তাদের শাসনের পতন ঘটায়।
বর্ম রাজবংশ :
একাদশ শতকের শেষভাগে পাল রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বর্ম উপাধিধারী এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। বঙ্গদেশে যিনি এ বংশের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি হলেন বজ্রবর্মার পুত্র জাতবর্মা। কলচুরিরাজ কর্ণের সাথে বর্মরা এদেশে এসেছিল বলে মনে হয়। পিতার মতো প্রথম দিকে তিনিও ছিলে কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেব এবং কর্ণের সামন্তরাজ। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের সময় তিনি শ্বশুর কলচুরিরাজ কর্ণের সাহায্য ও সমর্থনে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বর্মদের রাজধানী ছিল বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর। জাতবর্মার পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র হরিবর্মা একটানা ৪৬ বছর রাজত্ব করেন। পাল রাজাদের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। হরিবর্মা নাগাভূমি ও আসাম পর্যন্ত ক্ষমতা বিস্তার করেছিলেন। হরিবর্মার পর তাঁর এক পুত্র রাজা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজত্বকালের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁর পর জাতবর্মার অপর পুত্র সামলবর্মা রাজা হন। সামলবর্মার পুত্র ভোজবর্মা ছিলেন বর্ম রাজবংশের শেষ রাজা। কেননা, তাঁর পর এ বংশের আর কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। সম্ভবত: দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেনবংশীয় বিজয় সেন বর্ম শাসনের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ-পূ্র্ব বাংলায় সেন বংশের শাসনের সূচনা করেন।
সেন বংশ (১১৬১ খ্রি:-১২০৪ খ্রি:)
পাল বংশের পতনের পর বারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলাদেশে সেন রাজবংশের সূচনা হয়। ধারণা করা হয় তাঁরা এদেশে ছিলেন বহিরাগত। তাঁদের পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল সুদূর দক্ষিণাত্যের কর্ণাট। কেহ কেন মনে করেন তাঁরা ছিলেন ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’। যে বংশের লোকেরা প্রথমে ব্রাহ্মণ থাকে এবং পরে পেশা পরিবর্তন করে ক্ষত্রিয় হয়, তাদেরকে বলা হয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’। বাংলার সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন। তিনি যৌবনে কর্ণাটে বীরত্ব প্রদর্শন করে শেষ বয়সে প্রথমে বসতি স্থাপন করেন রাঢ় অঞ্চলে গঙ্গা নদীর তীরে। তিনি কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করায় সেন বংশের প্রথম রাজার মর্যাদা দেওয়া হয় সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেনকে। ধারণা করা হয় পাল রাজা রামপালের অধীনে তিনি একজন সামন্ত রাজা ছিলেন।
হেমন্ত সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বিজয় সেন (১০৯৮-১১৬০ খ্রি:) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজত্বকালেই সেন বংশের শাসন শক্তিশালী ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনিই সম্ভবত সামন্তরাজা হতে নিজেকে স্বাধীন রাজারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের সময় তিনি রামপালকে সাহায্য করেন। একাদশ শতকে দক্ষিণ রাঢ় শূর বংশের অধিকারে ছিল। এ বংশের রাজকন্যা বিলাসদেবীকে তিনি বিয়ে করেন। বরেন্দ্র উদ্ধারে রামপালকে সাহায্য করার বিনিময়ে বিজয় সেন স্বাধীনতার স্বীকৃতি পান। আবার দক্ষিণ রাঢ়ের শূর বংশের সহিত বৈবাহিক আত্মীয়তার সূত্র ধরে রাঢ় বিজয় সেনের অধিকারে আসে। এরপর বিজয় সেন বর্মরাজাকে পরাজিত করে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা সেন অধিকারে নিয়ে আসেন। শেষ পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিজয় সেন মদনপালকে পরাজিত করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা হতে পালদের বিতাড়িত করে নিজ প্রভুত্ব বিস্তার করেন। এরপর তিনি কামরুপ, কলিঙ্গ ও মিথিলা আক্রমণ করেন। হুগলী জেলার ত্রিবেনীতে অবস্থিত বিজয়পুর ছিল বিজয় সেনের প্রথম রাজধানী। দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করা হয় বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। বিজয় সেন পরম মাহেশ্বর, পরমেশ্বর, পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ, অরিরাজ-বৃষভ-শঙ্কর প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন। সেন বংশের অধীনেই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলা দীর্ঘকালব্যাপী একক রাজার অধীনে ছিল।
ধর্মের দিক হতে বিজয় সেন ছিলেন শৈব। কবি উমাপতিধর বিজয় সেন কর্তৃক অনুষ্ঠিত যাগ-যজ্ঞের কথা বলেছেন। এসব যাগ-যজ্ঞ হতে অনুমান করা হয় যে বিজয় সেন বৈদিক ধর্মের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কিন্তু কেহ কেহ মনে করেন বিজয় সেন গোঁড়া হিন্দু ছিলেন। অন্য ধর্মের প্রতি তাঁর কোন সহিষ্ণুতা ছিলনা। এজন্যই বিজয় সেন ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এদেশে বৌদ্ধধর্ম তেমন বিস্তার লাভ করতে পারেনি। বিজয় সেনের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর পুত্র বল-ল সেন (১১৬০-১১৭৮ খ্রি:)। তাঁর রাজত্বকালে তিনি শুধুা পিতৃরাজ্য রক্ষাই করেননি, মগধ ও মিথিলাও সেন রাজ্যভুক্ত করে সেন শাসন শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। চালুক্য রাজকন্যা রমাদেবীকে তিনি বিয়ে করেন। অন্যান্য উপাধির সাথে বল-ল সেন নিজের নামের সাথে ‘অরিরাজা নিঃশঙ্ক শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে পুত্র লক্ষণ সেনের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ত্রিবেনীর নিকট গঙ্গাতীরে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে শেষ জীবন অতিবাহিত করেন।
বল-ল সেন অত্যন্ত সুপণ্ডিত ছিলেন। বিদ্যা ও বিদ্বানের প্রতি তাঁর যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। তিনি বেদ, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতিা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। তাঁর একটি বিরাট গ্রন্থালয় ছিল। কবি বা লেখক হিসেবে সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর দান অপরিসীম। তাঁর পূর্বে বাংলার কোনো প্রাচীন রাজা এরূপ লেখনি প্রতিভার পরিচয় দিতে পারেননি। তিনি ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্য ‘অদ্ভুতসাগর’ গ্রন্থের অসমাপ্ত অংশ তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন সম্পূর্ণ করেছিলেন। এ গ্রন্থদ্বয় তাঁর আমলের ইতিহাসের অতীব মূল্যবান উপকরণ। তিনি রামপালে নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। বল-ল সেন তন্ত্র হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফলে, তাঁর রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিপত্তি বৃদ্ধিা পায় এবং বৌদ্ধ ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি হিন্দু সমাজকে নতুন করে গঠন করার উদ্দেশ্যে ‘কৌলিন্য প্রথা’ প্রবর্তন করেছিলেন। এর ফলে সামাজিক আচার-ব্যবহার, বিবাহ অনুষ্ঠান প্রভৃতি বিষয়ে কুলীন শ্রেণির লোকদিগকে কতকগুলো বিশেষ রীতিনীতি মেনে চলতে হতো।
বল-ল সেনের পর তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন (১১৭৮-১২০৫ খ্রি:) প্রায় ৬০ বৎসর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। পিতাা ও পিতামহের ন্যায় লক্ষণ সেনও সুদক্ষ যোদ্ধা ছিলেন এবং রণক্ষেত্রে নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। তিনি প্রাগ-জ্যোতিষ, গৌড়, কলিঙ্গ, কাশী, মগধ প্রভৃতি অঞ্চল সেন সাম্রাজভুক্ত করেন। কিন্তু তাঁর শেষ জীবন খুব সুখের ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিগ্রহ পরিচালনা ও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত শাসনের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েন এবং পিতার ন্যায় গঙ্গাতীরে দ্বিতীয় রাজধানী নবদ্বীপে বসবাস করতে শুরু করেন। ফলে গৌড় ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও অন্তঃবিরোধের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সৃষ্টি হয়। এ সুযোগে ১১৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান সুন্দরবন অঞ্চলে ডোম্মন পাল বিদ্রোহী হয়ে একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
লক্ষণ সেন নিজে সুপণ্ডিত ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘অদ্ভুতসাগর’ তিনিই সমাপ্ত করেছিলেন। লক্ষণ সেন রচিত কয়েকটি শে-কও পাওয়া গেছে। তাঁর রাজসভায় বহু পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সমাবেশ ঘটেছিল।া ধোয়ী, শরণ, জয়দেব, গোবর্ধন, উমাপতিধর প্রভৃতি প্রসিদ্ধ কবিগণ তাঁর সভা অলঙ্কৃত করতেন। ভারত প্রসিদ্ধ পণ্ডিত হলায়ূধ তাঁর প্রধানমন্ত্রী ও ধর্মীয় প্রধান ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে শ্রীধর দাস, পুরুষোত্তম, পশুপতি ও ঈশান বিখ্যাত। কবিদের মধ্যে গোবর্ধন ‘আর্য্যসপ্তদশী’, জয়দেব ‘গীতগোবিন্দ’ ও ধোয়ী ‘পবনদূত’ কাব্য রচনা করে অমরত্ব লাভ করেছিলেন। সাহিত্য ক্ষেত্র ব্যতীত শিল্প ক্ষেত্রেও বাংলা এ সময় উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল।
লক্ষণ সেন পিতা ও পিতামহের শৈব ধর্মের প্রতি অনুরাগ ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। পিতা ও পিতামহের ‘পরম মহেশ্বর’ উপাধির পরিবর্তে তিনি ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি শাস্ত্র ও ধর্ম চর্চায় পিতার উপযুক্ত পুত্র ছিলেন। মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজ তাঁর দানশীলতা ও ঔদার্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তেরো শতকের প্রথম দিকে মুসলিম সেনাপতি বখ্তিয়ার খল্জি নদিয়া আক্রমণ করেন। বৃদ্ধ লক্ষণ সেন কোন প্রতিরোধ না করে নদীপথে পূর্ববঙ্গের রাজধানী বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর আশ্রয় গ্রহণ করেন। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা বখতিয়ার খলজী সহজেই অধিকার করে নেন। লক্ষণাবতীকে (গৌড়) কেন্দ্র করে বাংলায় মুসলিম সামাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় অবস্থান করে লক্ষণ সেন আরও ২/৩ বৎসর রাজত্ব করেন। খুব সম্ভব ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১২০৫ খ্রি:) তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন কিছুকাল (১২০৩ খ্রি: পর্যন্ত) পূর্ব বাংলা শাসন করেন। তবু বলা চলে লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় সেন শাসনের অবসান ঘটে।
প্রাচীন বাংলার শাসন-ব্যবস্থা
গুপ্ত শাসনের পূর্বে প্রাচীন বাংলার রাজ্যশাসন পদ্ধতি সম্বন্ধে সঠিক কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। প্রাচীন বাংলার শাসন ব্যবস্থার বিবরণ দিতে গেলে সবার আগে কৌম সমাজের কথা মনে পড়ে। এদেশে গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই কৌম সমাজই ছিল সর্বেসর্বা। তখন রাজা ছিল না, রাজত্ব ছিল না। তবু শাসন-পদ্ধতি সামান্য মাত্রায় ছিল। তখন মানুষ একসাথে বসবাস করত। কোমদের মধ্যে পঞ্চায়েতী প্রথায় পঞ্চায়েত দ্বারা নির্বাচিত দলনেতা স্থানীয় কৌম শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্ব দিতেন। বাংলার এ কৌম ব্যবস্থা চিরস্থায়ী হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকের পূর্বেই বাংলায় কৌমতন্ত্র ভেঙ্গে গিয়ে রাজতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল।
গুপ্তদের সময় বাংলার শাসন-পদ্ধতির পরিষ্কার বিবরণ পাওয়া যায়। আনুমানিক দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে উত্তরবঙ্গ মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বাংলায় মৌর্য শাসনের কেন্দ্র ছিল পুন্ড্রনগর-বর্তমান বগুড়ার পাঁচ মাইল দূরে মহাস্থানগড়ে। মনে হয় ‘মহামাত্র’ নামক একজন রাজ প্রতিনিধির মাধ্যমে তখন বাংলায় মৌর্য শাসনকার্য পরিচালিত হতো। বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হলেও সমগ্র বাংলা গুপ্ত সম্রাটদের সরাসরি শাসনে ছিল না। বাংলার যে অংশ গুপ্ত সম্রাটদের সরাসরি শাসনে ছিল না তা ‘মহারাজা’ উপাধিধারী মহাসামন্তগণ প্রায় স্বাধীন ও আলাদাভাবে শাসন করতেন। এ সমস্ত সামন্ত রাজারা সব সময় গুপ্ত সম্রাটের কর্তৃত্বকে মেনে চলতেন। ধীরে ধীরে বাংলার সর্বত্র গুপ্ত সম্রাটদের শাসন চালু হয়। এ মহাসামন্তদের অধীনে বহু কর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন।
বাংলাদেশের যে অংশ সরাসরি গুপ্ত সম্রাটদের অধীনে ছিল তা কয়েকটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভাগের নাম ছিল ‘ভুক্তি’। প্রত্যেক ‘ভুক্তি’ আবার কয়েকটি বিষয়ে, প্রত্যেক বিষয় কয়েকটি মণ্ডলে, প্রত্যেক মণ্ডল কয়েকটি বীথিতে এবং প্রত্যেকটি বীথি কয়েকটি গ্রামে বিভক্ত ছিল। গ্রামই ছিল সবচেয়ে ছোট শাসন বিভাগ।
গুপ্ত সম্রাট নিজে ভুক্তির শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। কোনো কোনো সময় রাজকুমার বা রাজপরিবার থেকেও ভুক্তির শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হতো। ভুক্তিপতিকে বলা হত ‘উপরিক’। পরবর্তী সময়ে শাসকগণ ‘উপরিক মহারাজ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। সাধারণত ‘উপরিক মহারাজ’-ই তাঁর বিষয়গুলোর শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। কিন্তু কোনো কোনো সময়ে সম্রাট নিজে তাদের নিয়োগ করতেন। গুপ্তযুগের ভুক্তি ও বিষয়গুলোকে বর্তমান সময়ের ন্যায় বিভাগ ও জেলার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। গুপ্তদের সময় বাংলার বেসামরিক শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সামান্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সামরিক শাসন সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না। তেমনিভাবে রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞানও খুবই কম। এ ব্যাপারে মাত্র কয়েকজন কর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। এ হতে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, গুপ্তদের সময়ে মোটামুটি একটি সুষ্ঠু রাজস্ব ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।
ছয় শতকে উত্তর-পশ্চিম বাংলায় গুপ্তবংশের শাসন শেষ হয়ে যায়। বঙ্গ স্বাধীন ও আলাদা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন বঙ্গে যে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা মূলত গুপ্ত আমলের প্রাদেশিক শাসনের মতোই ছিল। গুপ্তদের সময়ে রাজতন্ত্র ছিল সামন্ত নির্ভর। এ আমলে তার পরিবর্তন হয়নি। বরং সামন্ততন্ত্রই আরও প্রসার লাভ করেছে। গুপ্ত রাজাদের মতো বাংলার সামন্ত রাজাগণও ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এঁরাও বিভিন্ন শ্রেণির বহুসংখ্যক রাজকর্মচারী নিয়োগ করতেন।
আট শতকের মাঝামাঝি সময়ে পাল বংশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গের নতুন যুগের শুরু হয়। পাল বংশের চার শতাব্দীর রাজত্বকালে বঙ্গে তাদের শাসন-ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পূর্বের মতো পাল যুগেও শাসন-ব্যবস্থার মূল কথা হলো রাজতন্ত্র। কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন বিভাগের সর্বোচ্চ ছিলেন রাজা স্বয়ং। পরাক্রান্ত পাল রাজারা প্রাচীন বাংলার ‘মহারাজ’ বা পরবর্তীকালের ‘মহারাজাধিরাজ’ পদবীতে সন্তুষ্ট থাকেননি। গুপ্ত সম্রাটগণের মতো তাঁরাও ‘পরমেশ্বর’, ‘পরমভট্টারক’, ‘মহারাজাধিরাজ’ প্রভৃতি গৌরবময় উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। রাজার পুত্র রাজা হতেন। এ নিয়ম থাকা সত্ত্বেও ভ্রাতা ও রাজ পরিবারের অন্যান্য নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিরোধ ও সংঘর্ষ হতো। এ সময় হতে সর্বপ্রথম একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান সচিবের উলে- পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সর্বপ্রধান রাজ কর্মচারী।
রাজ্যের সকল প্রকার শাসনকার্যের জন্য কতকগুলো নির্দিষ্ট শাসন-বিভাগ ছিল। এর প্রতিটি বিভাগের জন্য একজন অধ্যক্ষ নিযুক্ত থাকতেন। রাজা মন্ত্রী ও আমাত্যগণের সাহায্যে কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা করতেন। পিতা জীবিত থাকলেও অনেক সময় যুবরাজ শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের বিভিন্ন উৎস ছিল। এর মধ্যে নানা প্রকার কর ছিল প্রধান। বিভিন্ন রকমের রাজস্ব আদায়ের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব ও দলিল বিভাগ দেখাশুনা করার ব্যবস্থা ছিল। ভূমি রাজস্বের পরিমাণ ঠিক করার জন্য জমি জরিপের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। মুদ্রা এবং শস্যের আকারে রাজস্ব আদায় হতো। পাল রাজাদের সময়ে শান্তি রক্ষার জন্য সুন্দর বিচার ও পুলিশ বিভাগ ছিল। এ সময়ে গোপন সংবাদ সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর বাহিনী ছিল। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তী ও রণতরী- এ কটি বিভাগে সামরিক বাহিনী বিভক্ত ছিল।
গুপ্তদের মতো পালদের সময়েও সামন্ত রাজাদের উলে- পাওয়া যায়। এঁদের নানা উপাধি ছিল। কেন্দ্রীয় শাসনের শৌর্যখ ও বীর্য সামন্তদের অধীনতায় থাকতে বাধ্য করত। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে এঁরা স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। পাল শাসকদের শক্তি অনেকাংশে এরূপ সামন্তরাজদের সাহায্য ও সহযোগিতার উপর নির্ভর করত।
পাল রাজ্যে যে শাসন-পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছিল তা পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশ ও সেন রাজত্বকালে রাষ্ট্র শাসনের আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত লাভ করে। অবশ্য কোনো কোনো বিষয়ে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। সেন বংশীয় রাজারা পাল রাজাদের রাজ-উপাধি ছাড়াও নানাবিধ উপাধি ধারণ করতেন। এ সময়ে রানীকে রাজকীয় মর্যাদা দেয়া হয়েছে। শাসনকার্যে যুবরাজদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। জ্যৈষ্ঠ রাজকুমার যুবরাজ হতেন। পূর্বের মতো সেনদের সময়েও অনেক সামন্ত শাসক ছিলেন। তাঁদের শক্তি ও প্রভাব খুব প্রবল ছিল। এ সকল সামন্তরা প্রকৃতপক্ষে নিজ নিজ অঞ্চলে স্বাধীন রাজার মতোই চলতেন।
মোটামুটিভাবে এই ছিল প্রাচীন বাংলার শাসন-পদ্ধতি। এ শাসন ব্যবস্থায় বিদেশিদের প্রভাব কি পরিমাণ ছিল তা বলা যায় না। পণ্ডিতদের মতে, শাসন পদ্ধতির ব্যাপারে বাংলাদেশ সে সময়ে ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় মোটেই পিছিয়ে ছিল না।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার স্বাধীন রাজ্য
পাল যুগের বেশির ভাগ সময়েই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা স্বাধীন ছিল। তখন এ অঞ্চলটি ছিল বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি থেকে বেশ কিছু রাজবংশের রাজারা কখনো পাল রাজাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্বাধীনভাবে তাদের এলাকা শাসন করতেন, আবার কখনো পাল রাজাদের অধীনতা স্বীকার করে চলতেন।
খড়গ বংশ :
সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মগধ ও গৌড়ে পরবর্তী গুপ্তবংশীয় রাজাগণ প্রভুত্ব স্থাপন করেন। এ সময় খড়গ বংশের রাজারা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্যের সৃষ্টি করেন। তাঁদের রাজধানীর নাম ছিল কর্মান্ত বাসক। কুমিল- জেলার বড় কামতার প্রাচীন নামই সম্ভবত এ কর্মান্ত বাসক। খড়গদের অধিকার ত্রিপুরা ও নোয়াখালী অঞ্চলের উপর বিস্তৃত ছিল।
দেববংশ :
খড়গ বংশের শাসনের পর একই অঞ্চলে অষ্টম শতকের শুরুতে দেব বংশের উত্থান ঘটে। এ বংশের চারজন রাজার নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন শ্রীশান্তিদেব, শ্রীবীরদেব, শ্রীআনন্দদেব ও শ্রীভবদেব। দেব রাজারা নিজেদের খুব শক্তিধর মনে করতেন। তাই তাঁরা তাদের নামের সাথে যুক্ত করতেন বড় বড় উপাধি। যেমন- পরম সৌগত, পরম ভট্টারক, পরমেশ্বর মহারাজাধিরাজ ইত্যাদি। তাঁদের রাজধানী ছিল দেবপর্বতে। কুমিল-র নিকটা ময়নামতির কাছে ছিল এ দেবপর্বত। দেবদের রাজত্ব বিস্তৃত ছিল সমগ্র সমতট অঞ্চলে। আনুমানিক ৭৪০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেব রাজারা শাসন করেন।
কান্তিদেবের রাজ্য :
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার হরিকেল জনপদে নবম শতকে একটি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এ রাজ্যের রাজা ছিলেন কান্তিদেব। দেব রাজবংশের সঙ্গে কান্তিদেবের কোনো সম্পর্ক ছিল কি-না তা জানা যায় না। তাঁর পিতা ছিলেন ধনদত্ত ও পিতামহ ভদ্রদত্ত। বর্তমান সিলেট কান্তিদেবের রাজ্যভুক্ত ছিল। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল বর্ধমানপুর। বর্তমানে এ নামে কোনো অঞ্চলের অস্তিত্ব নেই। এ সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় চন্দ্র বংশ বলে পরিচিত নতুন এক শক্তির উদয় হয়। কান্তিদেবের গড়া রাজ্যের পতন হয় এ চন্দ্র বংশের হাতে।
চন্দ্রবংশ :
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সবচেয়ে শক্তিশালী স্বাধীন রাজবংশ ছিল চন্দ্র বংশ। দশম শতকের শুরু হতে একাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেড়শত বছর এ বংশের রাজারা শাসন করেন। চন্দ্রবংশের প্রথম নৃপতি পূর্ণচন্দ্র ও তৎপুত্র সুবর্ণচন্দ্র সম্ভবত রোহিতগিরির ভূ-স্বামী ছিলেন। সুবর্ণচন্দ্রের পুত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্রই এ বংশের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘মহারাজাধিরাজ’। ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেল, চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল ও পার্শ্ববর্তী এলাকা), বঙ্গ ও সমতট অর্থাৎ সমগ্র পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় নিজ বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। লালমাই পাহাড় ছিল চন্দ্র রাজাদের মূল কেন্দ্র। এ পাহাড় প্রাচীনকালে রোহিতগিরি নামে পরিচিত ছিল। আনুমানিক ত্রিশ বছরকাল (৯০০-৯৩০ খ্রি:) তিনি রাজত্ব করেন।
ত্রৈলোক্যচন্দ্রের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী ছিলেন তাঁর পুত্র শ্রীচন্দ্র। তাঁহার শাসনামলে চন্দ্র বংশের প্রতিপত্তি উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছায়। তিনি নিঃসন্দেহে বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ছিলেন। তিনি ‘পরমেশ্বর পরম ভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। তাঁর রাজ্য দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ছাড়াও উত্তর-পূর্ব কামরূপ ও উত্তরে গৌড় পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে তিনি তাঁর রাজধানী গড়ে তোলেন। শ্রীচন্দ্র প্রায় ৪৫ বছর (আ: ৯৩০-৯৭৫ খ্রি:) শৌর্যবীর্যের সহিত রাজত্ব করেন।
শ্রীচন্দ্রের পুত্র কল্যাণচন্দ্র (আ: ৯৭৫-১০০০ খ্রি:) ও পৌত্র লডহচন্দ্র (আ: ১০০০-১০২০ খ্রি:) চন্দ্র বংশের গৌরব অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। লডহচন্দ্রের পুত্র গোবিন্দচন্দ্র ছিলেন শেষ চন্দ্র রাজা। তাঁর রাজত্বকালে চোলরাজ রাজেন্দ্র চোল ও কলচুরিরাজ কর্ণ বঙ্গ আক্রমণ করেন। এই দুই বৈদেশিক আক্রমণ চন্দ্র রাজার ক্ষমতা হ্রাস করে তাদের শাসনের পতন ঘটায়।
বর্ম রাজবংশ :
একাদশ শতকের শেষভাগে পাল রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বর্ম উপাধিধারী এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। বঙ্গদেশে যিনি এ বংশের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি হলেন বজ্রবর্মার পুত্র জাতবর্মা। কলচুরিরাজ কর্ণের সাথে বর্মরা এদেশে এসেছিল বলে মনে হয়। পিতার মতো প্রথম দিকে তিনিও ছিলে কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেব এবং কর্ণের সামন্তরাজ। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের সময় তিনি শ্বশুর কলচুরিরাজ কর্ণের সাহায্য ও সমর্থনে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। বর্মদের রাজধানী ছিল বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর। জাতবর্মার পর তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র হরিবর্মা একটানা ৪৬ বছর রাজত্ব করেন। পাল রাজাদের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। হরিবর্মা নাগাভূমি ও আসাম পর্যন্ত ক্ষমতা বিস্তার করেছিলেন। হরিবর্মার পর তাঁর এক পুত্র রাজা হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজত্বকালের কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁর পর জাতবর্মার অপর পুত্র সামলবর্মা রাজা হন। সামলবর্মার পুত্র ভোজবর্মা ছিলেন বর্ম রাজবংশের শেষ রাজা। কেননা, তাঁর পর এ বংশের আর কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। সম্ভবত: দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেনবংশীয় বিজয় সেন বর্ম শাসনের অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণ-পূ্র্ব বাংলায় সেন বংশের শাসনের সূচনা করেন।
সেন বংশ (১১৬১ খ্রি:-১২০৪ খ্রি:)
পাল বংশের পতনের পর বারো শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাংলাদেশে সেন রাজবংশের সূচনা হয়। ধারণা করা হয় তাঁরা এদেশে ছিলেন বহিরাগত। তাঁদের পূর্বপুরুষদের আদি বাসস্থান ছিল সুদূর দক্ষিণাত্যের কর্ণাট। কেহ কেন মনে করেন তাঁরা ছিলেন ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’। যে বংশের লোকেরা প্রথমে ব্রাহ্মণ থাকে এবং পরে পেশা পরিবর্তন করে ক্ষত্রিয় হয়, তাদেরকে বলা হয় ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’। বাংলার সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন। তিনি যৌবনে কর্ণাটে বীরত্ব প্রদর্শন করে শেষ বয়সে প্রথমে বসতি স্থাপন করেন রাঢ় অঞ্চলে গঙ্গা নদীর তীরে। তিনি কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করায় সেন বংশের প্রথম রাজার মর্যাদা দেওয়া হয় সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেনকে। ধারণা করা হয় পাল রাজা রামপালের অধীনে তিনি একজন সামন্ত রাজা ছিলেন।
হেমন্ত সেনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র বিজয় সেন (১০৯৮-১১৬০ খ্রি:) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর এই সুদীর্ঘ রাজত্বকালেই সেন বংশের শাসন শক্তিশালী ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনিই সম্ভবত সামন্তরাজা হতে নিজেকে স্বাধীন রাজারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের সময় তিনি রামপালকে সাহায্য করেন। একাদশ শতকে দক্ষিণ রাঢ় শূর বংশের অধিকারে ছিল। এ বংশের রাজকন্যা বিলাসদেবীকে তিনি বিয়ে করেন। বরেন্দ্র উদ্ধারে রামপালকে সাহায্য করার বিনিময়ে বিজয় সেন স্বাধীনতার স্বীকৃতি পান। আবার দক্ষিণ রাঢ়ের শূর বংশের সহিত বৈবাহিক আত্মীয়তার সূত্র ধরে রাঢ় বিজয় সেনের অধিকারে আসে। এরপর বিজয় সেন বর্মরাজাকে পরাজিত করে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা সেন অধিকারে নিয়ে আসেন। শেষ পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিজয় সেন মদনপালকে পরাজিত করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা হতে পালদের বিতাড়িত করে নিজ প্রভুত্ব বিস্তার করেন। এরপর তিনি কামরুপ, কলিঙ্গ ও মিথিলা আক্রমণ করেন। হুগলী জেলার ত্রিবেনীতে অবস্থিত বিজয়পুর ছিল বিজয় সেনের প্রথম রাজধানী। দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করা হয় বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। বিজয় সেন পরম মাহেশ্বর, পরমেশ্বর, পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ, অরিরাজ-বৃষভ-শঙ্কর প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন। সেন বংশের অধীনেই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলা দীর্ঘকালব্যাপী একক রাজার অধীনে ছিল।
ধর্মের দিক হতে বিজয় সেন ছিলেন শৈব। কবি উমাপতিধর বিজয় সেন কর্তৃক অনুষ্ঠিত যাগ-যজ্ঞের কথা বলেছেন। এসব যাগ-যজ্ঞ হতে অনুমান করা হয় যে বিজয় সেন বৈদিক ধর্মের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কিন্তু কেহ কেহ মনে করেন বিজয় সেন গোঁড়া হিন্দু ছিলেন। অন্য ধর্মের প্রতি তাঁর কোন সহিষ্ণুতা ছিলনা। এজন্যই বিজয় সেন ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এদেশে বৌদ্ধধর্ম তেমন বিস্তার লাভ করতে পারেনি। বিজয় সেনের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর পুত্র বল-ল সেন (১১৬০-১১৭৮ খ্রি:)। তাঁর রাজত্বকালে তিনি শুধুা পিতৃরাজ্য রক্ষাই করেননি, মগধ ও মিথিলাও সেন রাজ্যভুক্ত করে সেন শাসন শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেন। চালুক্য রাজকন্যা রমাদেবীকে তিনি বিয়ে করেন। অন্যান্য উপাধির সাথে বল-ল সেন নিজের নামের সাথে ‘অরিরাজা নিঃশঙ্ক শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে পুত্র লক্ষণ সেনের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ত্রিবেনীর নিকট গঙ্গাতীরে বানপ্রস্থ অবলম্বন করে শেষ জীবন অতিবাহিত করেন।
বল-ল সেন অত্যন্ত সুপণ্ডিত ছিলেন। বিদ্যা ও বিদ্বানের প্রতি তাঁর যথেষ্ট অনুরাগ ছিল। তিনি বেদ, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতিা শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। তাঁর একটি বিরাট গ্রন্থালয় ছিল। কবি বা লেখক হিসেবে সংস্কৃত সাহিত্যে তাঁর দান অপরিসীম। তাঁর পূর্বে বাংলার কোনো প্রাচীন রাজা এরূপ লেখনি প্রতিভার পরিচয় দিতে পারেননি। তিনি ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্য ‘অদ্ভুতসাগর’ গ্রন্থের অসমাপ্ত অংশ তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন সম্পূর্ণ করেছিলেন। এ গ্রন্থদ্বয় তাঁর আমলের ইতিহাসের অতীব মূল্যবান উপকরণ। তিনি রামপালে নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। বল-ল সেন তন্ত্র হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ফলে, তাঁর রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিপত্তি বৃদ্ধিা পায় এবং বৌদ্ধ ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। তিনি হিন্দু সমাজকে নতুন করে গঠন করার উদ্দেশ্যে ‘কৌলিন্য প্রথা’ প্রবর্তন করেছিলেন। এর ফলে সামাজিক আচার-ব্যবহার, বিবাহ অনুষ্ঠান প্রভৃতি বিষয়ে কুলীন শ্রেণির লোকদিগকে কতকগুলো বিশেষ রীতিনীতি মেনে চলতে হতো।
বল-ল সেনের পর তাঁর পুত্র লক্ষণ সেন (১১৭৮-১২০৫ খ্রি:) প্রায় ৬০ বৎসর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। পিতাা ও পিতামহের ন্যায় লক্ষণ সেনও সুদক্ষ যোদ্ধা ছিলেন এবং রণক্ষেত্রে নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। তিনি প্রাগ-জ্যোতিষ, গৌড়, কলিঙ্গ, কাশী, মগধ প্রভৃতি অঞ্চল সেন সাম্রাজভুক্ত করেন। কিন্তু তাঁর শেষ জীবন খুব সুখের ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিগ্রহ পরিচালনা ও বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত শাসনের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েন এবং পিতার ন্যায় গঙ্গাতীরে দ্বিতীয় রাজধানী নবদ্বীপে বসবাস করতে শুরু করেন। ফলে গৌড় ভয়াবহ ষড়যন্ত্র ও অন্তঃবিরোধের লীলাক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সৃষ্টি হয়। এ সুযোগে ১১৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান সুন্দরবন অঞ্চলে ডোম্মন পাল বিদ্রোহী হয়ে একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।
লক্ষণ সেন নিজে সুপণ্ডিত ও বিদ্যোৎসাহী ছিলেন। পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ ‘অদ্ভুতসাগর’ তিনিই সমাপ্ত করেছিলেন। লক্ষণ সেন রচিত কয়েকটি শে-কও পাওয়া গেছে। তাঁর রাজসভায় বহু পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের সমাবেশ ঘটেছিল।া ধোয়ী, শরণ, জয়দেব, গোবর্ধন, উমাপতিধর প্রভৃতি প্রসিদ্ধ কবিগণ তাঁর সভা অলঙ্কৃত করতেন। ভারত প্রসিদ্ধ পণ্ডিত হলায়ূধ তাঁর প্রধানমন্ত্রী ও ধর্মীয় প্রধান ছিলেন। তাঁর সমসাময়িক অন্যান্য পণ্ডিতদের মধ্যে শ্রীধর দাস, পুরুষোত্তম, পশুপতি ও ঈশান বিখ্যাত। কবিদের মধ্যে গোবর্ধন ‘আর্য্যসপ্তদশী’, জয়দেব ‘গীতগোবিন্দ’ ও ধোয়ী ‘পবনদূত’ কাব্য রচনা করে অমরত্ব লাভ করেছিলেন। সাহিত্য ক্ষেত্র ব্যতীত শিল্প ক্ষেত্রেও বাংলা এ সময় উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছিল।
লক্ষণ সেন পিতা ও পিতামহের শৈব ধর্মের প্রতি অনুরাগ ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। পিতা ও পিতামহের ‘পরম মহেশ্বর’ উপাধির পরিবর্তে তিনি ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি গ্রহণ করেন। তিনি শাস্ত্র ও ধর্ম চর্চায় পিতার উপযুক্ত পুত্র ছিলেন। মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজ তাঁর দানশীলতা ও ঔদার্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তেরো শতকের প্রথম দিকে মুসলিম সেনাপতি বখ্তিয়ার খল্জি নদিয়া আক্রমণ করেন। বৃদ্ধ লক্ষণ সেন কোন প্রতিরোধ না করে নদীপথে পূর্ববঙ্গের রাজধানী বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর আশ্রয় গ্রহণ করেন। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা বখতিয়ার খলজী সহজেই অধিকার করে নেন। লক্ষণাবতীকে (গৌড়) কেন্দ্র করে বাংলায় মুসলিম সামাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় অবস্থান করে লক্ষণ সেন আরও ২/৩ বৎসর রাজত্ব করেন। খুব সম্ভব ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১২০৫ খ্রি:) তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন কিছুকাল (১২০৩ খ্রি: পর্যন্ত) পূর্ব বাংলা শাসন করেন। তবু বলা চলে লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় সেন শাসনের অবসান ঘটে।
প্রাচীন বাংলার শাসন-ব্যবস্থা
গুপ্ত শাসনের পূর্বে প্রাচীন বাংলার রাজ্যশাসন পদ্ধতি সম্বন্ধে সঠিক কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। প্রাচীন বাংলার শাসন ব্যবস্থার বিবরণ দিতে গেলে সবার আগে কৌম সমাজের কথা মনে পড়ে। এদেশে গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই কৌম সমাজই ছিল সর্বেসর্বা। তখন রাজা ছিল না, রাজত্ব ছিল না। তবু শাসন-পদ্ধতি সামান্য মাত্রায় ছিল। তখন মানুষ একসাথে বসবাস করত। কোমদের মধ্যে পঞ্চায়েতী প্রথায় পঞ্চায়েত দ্বারা নির্বাচিত দলনেতা স্থানীয় কৌম শাসনব্যবস্থায় নেতৃত্ব দিতেন। বাংলার এ কৌম ব্যবস্থা চিরস্থায়ী হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকের পূর্বেই বাংলায় কৌমতন্ত্র ভেঙ্গে গিয়ে রাজতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল।
গুপ্তদের সময় বাংলার শাসন-পদ্ধতির পরিষ্কার বিবরণ পাওয়া যায়। আনুমানিক দ্বিতীয়-তৃতীয় শতকে উত্তরবঙ্গ মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। বাংলায় মৌর্য শাসনের কেন্দ্র ছিল পুন্ড্রনগর-বর্তমান বগুড়ার পাঁচ মাইল দূরে মহাস্থানগড়ে। মনে হয় ‘মহামাত্র’ নামক একজন রাজ প্রতিনিধির মাধ্যমে তখন বাংলায় মৌর্য শাসনকার্য পরিচালিত হতো। বাংলা গুপ্ত সাম্রাজ্যভুক্ত হলেও সমগ্র বাংলা গুপ্ত সম্রাটদের সরাসরি শাসনে ছিল না। বাংলার যে অংশ গুপ্ত সম্রাটদের সরাসরি শাসনে ছিল না তা ‘মহারাজা’ উপাধিধারী মহাসামন্তগণ প্রায় স্বাধীন ও আলাদাভাবে শাসন করতেন। এ সমস্ত সামন্ত রাজারা সব সময় গুপ্ত সম্রাটের কর্তৃত্বকে মেনে চলতেন। ধীরে ধীরে বাংলার সর্বত্র গুপ্ত সম্রাটদের শাসন চালু হয়। এ মহাসামন্তদের অধীনে বহু কর্মচারী নিযুক্ত থাকতেন।
বাংলাদেশের যে অংশ সরাসরি গুপ্ত সম্রাটদের অধীনে ছিল তা কয়েকটি প্রশাসনিক বিভাগে বিভক্ত ছিল। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিভাগের নাম ছিল ‘ভুক্তি’। প্রত্যেক ‘ভুক্তি’ আবার কয়েকটি বিষয়ে, প্রত্যেক বিষয় কয়েকটি মণ্ডলে, প্রত্যেক মণ্ডল কয়েকটি বীথিতে এবং প্রত্যেকটি বীথি কয়েকটি গ্রামে বিভক্ত ছিল। গ্রামই ছিল সবচেয়ে ছোট শাসন বিভাগ।
গুপ্ত সম্রাট নিজে ভুক্তির শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। কোনো কোনো সময় রাজকুমার বা রাজপরিবার থেকেও ভুক্তির শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হতো। ভুক্তিপতিকে বলা হত ‘উপরিক’। পরবর্তী সময়ে শাসকগণ ‘উপরিক মহারাজ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। সাধারণত ‘উপরিক মহারাজ’-ই তাঁর বিষয়গুলোর শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। কিন্তু কোনো কোনো সময়ে সম্রাট নিজে তাদের নিয়োগ করতেন। গুপ্তযুগের ভুক্তি ও বিষয়গুলোকে বর্তমান সময়ের ন্যায় বিভাগ ও জেলার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। গুপ্তদের সময় বাংলার বেসামরিক শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সামান্য তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু সামরিক শাসন সম্পর্কে কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না। তেমনিভাবে রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞানও খুবই কম। এ ব্যাপারে মাত্র কয়েকজন কর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। এ হতে স্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে, গুপ্তদের সময়ে মোটামুটি একটি সুষ্ঠু রাজস্ব ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।
ছয় শতকে উত্তর-পশ্চিম বাংলায় গুপ্তবংশের শাসন শেষ হয়ে যায়। বঙ্গ স্বাধীন ও আলাদা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তখন বঙ্গে যে নতুন রাষ্ট্র ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তা মূলত গুপ্ত আমলের প্রাদেশিক শাসনের মতোই ছিল। গুপ্তদের সময়ে রাজতন্ত্র ছিল সামন্ত নির্ভর। এ আমলে তার পরিবর্তন হয়নি। বরং সামন্ততন্ত্রই আরও প্রসার লাভ করেছে। গুপ্ত রাজাদের মতো বাংলার সামন্ত রাজাগণও ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। এঁরাও বিভিন্ন শ্রেণির বহুসংখ্যক রাজকর্মচারী নিয়োগ করতেন।
আট শতকের মাঝামাঝি সময়ে পাল বংশের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গের নতুন যুগের শুরু হয়। পাল বংশের চার শতাব্দীর রাজত্বকালে বঙ্গে তাদের শাসন-ব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পূর্বের মতো পাল যুগেও শাসন-ব্যবস্থার মূল কথা হলো রাজতন্ত্র। কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন বিভাগের সর্বোচ্চ ছিলেন রাজা স্বয়ং। পরাক্রান্ত পাল রাজারা প্রাচীন বাংলার ‘মহারাজ’ বা পরবর্তীকালের ‘মহারাজাধিরাজ’ পদবীতে সন্তুষ্ট থাকেননি। গুপ্ত সম্রাটগণের মতো তাঁরাও ‘পরমেশ্বর’, ‘পরমভট্টারক’, ‘মহারাজাধিরাজ’ প্রভৃতি গৌরবময় উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। রাজার পুত্র রাজা হতেন। এ নিয়ম থাকা সত্ত্বেও ভ্রাতা ও রাজ পরিবারের অন্যান্য নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিরোধ ও সংঘর্ষ হতো। এ সময় হতে সর্বপ্রথম একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান সচিবের উলে- পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন সর্বপ্রধান রাজ কর্মচারী।
রাজ্যের সকল প্রকার শাসনকার্যের জন্য কতকগুলো নির্দিষ্ট শাসন-বিভাগ ছিল। এর প্রতিটি বিভাগের জন্য একজন অধ্যক্ষ নিযুক্ত থাকতেন। রাজা মন্ত্রী ও আমাত্যগণের সাহায্যে কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা করতেন। পিতা জীবিত থাকলেও অনেক সময় যুবরাজ শাসনকার্য পরিচালনা করতেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের বিভিন্ন উৎস ছিল। এর মধ্যে নানা প্রকার কর ছিল প্রধান। বিভিন্ন রকমের রাজস্ব আদায়ের জন্য বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারী নিযুক্ত ছিল। রাজস্ব আয়-ব্যয়ের হিসাব ও দলিল বিভাগ দেখাশুনা করার ব্যবস্থা ছিল। ভূমি রাজস্বের পরিমাণ ঠিক করার জন্য জমি জরিপের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হতো। মুদ্রা এবং শস্যের আকারে রাজস্ব আদায় হতো। পাল রাজাদের সময়ে শান্তি রক্ষার জন্য সুন্দর বিচার ও পুলিশ বিভাগ ছিল। এ সময়ে গোপন সংবাদ সংগ্রহের জন্য গুপ্তচর বাহিনী ছিল। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তী ও রণতরী- এ কটি বিভাগে সামরিক বাহিনী বিভক্ত ছিল।
গুপ্তদের মতো পালদের সময়েও সামন্ত রাজাদের উলে- পাওয়া যায়। এঁদের নানা উপাধি ছিল। কেন্দ্রীয় শাসনের শৌর্যখ ও বীর্য সামন্তদের অধীনতায় থাকতে বাধ্য করত। অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগে এঁরা স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। পাল শাসকদের শক্তি অনেকাংশে এরূপ সামন্তরাজদের সাহায্য ও সহযোগিতার উপর নির্ভর করত।
পাল রাজ্যে যে শাসন-পদ্ধতি প্রচলিত হয়েছিল তা পরবর্তী সময়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশ ও সেন রাজত্বকালে রাষ্ট্র শাসনের আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত লাভ করে। অবশ্য কোনো কোনো বিষয়ে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটেছিল। সেন বংশীয় রাজারা পাল রাজাদের রাজ-উপাধি ছাড়াও নানাবিধ উপাধি ধারণ করতেন। এ সময়ে রানীকে রাজকীয় মর্যাদা দেয়া হয়েছে। শাসনকার্যে যুবরাজদের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। জ্যৈষ্ঠ রাজকুমার যুবরাজ হতেন। পূর্বের মতো সেনদের সময়েও অনেক সামন্ত শাসক ছিলেন। তাঁদের শক্তি ও প্রভাব খুব প্রবল ছিল। এ সকল সামন্তরা প্রকৃতপক্ষে নিজ নিজ অঞ্চলে স্বাধীন রাজার মতোই চলতেন।
মোটামুটিভাবে এই ছিল প্রাচীন বাংলার শাসন-পদ্ধতি। এ শাসন ব্যবস্থায় বিদেশিদের প্রভাব কি পরিমাণ ছিল তা বলা যায় না। পণ্ডিতদের মতে, শাসন পদ্ধতির ব্যাপারে বাংলাদেশ সে সময়ে ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় মোটেই পিছিয়ে ছিল না।
এই ব্লগের লেখাসমূহ সরাসরি বোর্ড বই থেকে উদ্ধৃত এবং Creative Commons
Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License এর
আওতায় প্রকাশিত।
প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করাই তার স্বভাব। এভাবে বাস করতে
হলে চাই একে অন্যের সাথে সহযোগিতা। এ কারণেই মানুষের প্রয়োজন পড়ে বিভিন্ন
সামাজিক অর্থনেতিক ও রাজনৈতিক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। জীবন
বাঁচাতে তিনটি জিনিসের প্রথম প্রয়োজন- খাদ্য, বস্ত্র এবং বাসস্থান। এরপরই
মানুষ জীবনকে সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে মনোযোগ দেয় শিক্ষা, বিজ্ঞান,
শিল্পকলা, আইন প্রভৃতির উন্নয়নে। সমাজ জীবন বিকাশে মানুষের এ সমস্ত
কাজকর্মের একত্রিত রূপই হচ্ছে তার সংস্কৃতি। আর্যদের আগমনের পূর্বে বাংলার
প্রাচীন মানুষেরা একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে তুলেছিল। বাংলার
সমাজ-সংস্কৃতির এটাই সবচেয়ে প্রাচীন রূপ। পণ্ডিতদের মতে, এদের ভাষার নাম
ছিল ‘অষ্ট্রিক’। জাতি হিসেবে এদের বলা হতো নিষাদ। এরপর বাংলার ক্ষুদ্র
নৃগোষ্ঠীর সাথে মিশে যায় ‘আলপাইন’ নামে এক জাতি। আর্যরা এদেশে আসার পূর্বে
এরা মিলেমিশে বাংলার সংস্কৃতি গড়ে তোলে। বাঙালির জন প্রকৃতিতে বিভিন্ন
মানবগোষ্ঠীর ধারা এসে মিলিত হয়েছে। ফলে তাদের ‘সংকর-জন’ হিসেবে পরিচিত
করেছে। বহু বছর বিচিত্র আদান-প্রদান ও মিশ্রণের ফলে বাঙালির একটি নিজস্ব
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বৈশিষ্ট্য দাঁড়িয়েছে। ফলে অধিকাংশ বাঙালির মাথা গোল আকৃতির,
চুল কালো, চোখের মনি পাতলা হতে ঘন কালো, নাকের আকৃতি মোটামুটি মধ্যম,
গায়ের রং সাধারণত শ্যামলা, মুখমণ্ডলের গঠন মধ্যম আকৃতির অর্থাৎ গোল বা
লম্বা নয়। এ মধ্যম আকৃতির দেহ লক্ষণই বাঙালির বৈশিষ্ট্য।
প্রাচীন বাংলার সমাজ, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
প্রাচীন বাংলার সামাজিক জীবন
মৌর্য শাসনের পূর্বে ব্যাপক অর্থে বাংলার অধিবাসীদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয়
গড়ে ওঠেনি। এ সময়ে সমাজ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল। একে বলা হতো কৌম সমাজ।
আর্যদের পূর্বে কিছু কিছু ধর্মচিন্তা পরবর্তী সময়ে এদেশের হিন্দু ধর্মে
ছড়িয়ে পড়ে। এগুলোর মধ্যে উলে- যোগ্য হলো-কর্মফল, জন্মান্তরবাদ, যোগ সাধনা
ইত্যাদি। এ যুগের অনেক সামাজিক প্রথা ও আচার-আচরণের প্রভাব পরবর্তী সময়ে
হিন্দু সমাজে লক্ষ করা যায়। যেমন- অতিথিদের পান-সুপারি খেতে দেয়া, শীবের
গীত গাওয়া, বিয়েতে গায়ে হলুদ দেয়া, ধূতি-শাড়ি পরা এবং মেয়েদের কপালে সিঁদুর
দেয়া ইত্যাদি।
আর্য সমাজের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অঙ্গ ছিল জাতিভেদ প্রথা। তারা দীর্ঘদিন ধরে
এদেশে বসবাস করার ফলে বাংলায়ও এ ব্যবস্থা চালু হয়। প্রাচীনকালে বাংলায়
ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র- এ চার প্রকার বর্ণ ছিল। পরবর্তী সময়ে
আরও নানা প্রকার সঙ্কর অর্থাৎ মিশ্র জাতির সৃষ্টি হয়। সমাজে প্রত্যেক
জাতিরই নির্দিষ্ট পেশা ছিল। অধ্যয়ন, অধ্যাপনা ও পূজা পার্বন করা- এগুলো ছিল
ব্রাহ্মণদের নির্দিষ্ট কর্ম। তারা সমাজে সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করতেন।
ক্ষত্রিয়দের পেশা ছিল যুদ্ধ করা। ব্যবসা-বাণিজ্য করা ছিল বৈশ্যদের কাজ।
সবচেয়ে নিচু শ্রেণির শূদ্ররা সাধারণত কৃষিকাজ, মাছ শিকার ও অন্যান্য
ছোটখাটো কাজ করত। ব্রাহ্মণ ছাড়া বাকী সব বর্ণের মানুষ একে অন্যের সাথে
মেলামেশা করত। সাধারণত এক জাতির মধ্যেই বিবাহ হতো, তবে উচ্চ শ্রেণির বর ও
নিম্ন শ্রেণির কন্যার মধ্যে বিবাহও চালু ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসব
ব্যাপারে কঠোর নিয়ম চালু হয়।
তখনকার দিনে বিদেশ ভ্রমণকারী বাঙালি পুরুষদের কোনো সুনাম ছিলনা। কিন্তু
বাঙ্গালি মেয়েদের গুণাবলীর জন্য সুখ্যাতি ছিল। মেয়েরা লেখাপড়া শিখত। সে
যুগে অবরোধ বা পর্দাপ্রথা ছিলনা। তবে বাংলার মেয়েদের কোনো প্রকার স্বাধীনতা
ছিলনা। একটিমাত্র স্ত্রী গ্রহণই ছিল সমাজের নিয়ম। তবে পুরুষেরা বহু স্ত্রী
রাখতে পারত। বিধবাকে নিরামিষ আহার করে সব ধরনের বিলাসিতা ত্যাগ করতে হতো।
স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকেও মৃত স্বামীর চিতায় জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। এ
প্রথাকে বলা হয় ‘সতীদাহ প্রথা’। ধন-সম্পত্তিতে নারীদের কোনো আইনগত অধিকার
ছিলনা। বাংলার প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে বাঙালির উন্নত চরিত্রের কথা জানা যায়।
কিন্তু তাই বলে বাঙালির সামাজিক জীবনে কোনরূপ দুর্নীতি ও অশ-লতা ছিলনা, এমন
কথা বলা যায় না।
বাঙালির প্রধান খাদ্য বর্তমান সময়ের মত তখনও ছিল ভাত, মাছ, মাংস, শাক-সবজি,
দুধ, দধি, ঘৃত, ক্ষীর ইত্যাদি। চাউল হতে প্রস্তুত নানা প্রকার পিঠাও
জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার ছিল। বাঙ্গালি ব্রাহ্মণেরা আমিষ খেতেন। তখন সকল
প্রকার মাছ পাওয়া যেত। পূর্ববঙ্গে ইলিশ ও শুঁটকি মাছ খুব প্রিয় খাবার ছিল।
তরকারির মধ্যে বেগুন, লাউ, কুমড়া, ঝিংগে, কাকরুল, কচু উৎপন্ন হতো। ফলের
মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, তাল, পেঁপে, নারকেল, ইক্ষু পাওয়া যেত। তবে ডালের
কথা কোথাও বলা নেই। দুধ, নারকেলের পানি, ইক্ষুরস, তালরস ছাড়া মদ জাতীয় নানা
প্রকার পানীয় সুপ্রচলিত ছিল। ভাত, গম, ইক্ষু, গুড়, মধু ও তালরস গাঁজাইয়া
নানা প্রকার মদ তৈরি হতো। মদ জাতীয় নানা প্রকারের পানীয় পান করা হতো।
খাওয়া-দাওয়া শেষে মসলাযুক্ত পান খাওয়ার রীতি ছিল।
পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে রাজা-মহারাজা ও ধনীদের কথা বাদ দিলে বিশেষ কোনো
আড়ম্বর তখন ছিলনা। বাংলার নর-নারীরা যথাক্রমে ধূতি ও শাড়ি পরিধান করত।
পুরুষেরা মালকোচা দিয়ে ধূতি পরত এবং তা হাঁটুর নিচে নামত না। মেয়েদের শাড়ি
গোড়ালী পর্যন্ত পৌঁছাত। মাঝে মাঝে পুরুষেরা গায়ে চাদর, আর মেয়েরা পড়ত ওড়না।
উৎসব-অনুষ্ঠানে বিশেষ পোশাকের ব্যবস্থা ছিল। পুরুষ-নারী উভয়ের মধ্যেই
অলংকার ব্যবহারের রীতি প্রচলিত ছিল। তারা কানে কুণ্ডল, গলায় হার, আঙ্গুলে
আংটি, হাতে বালা ও পায়ে মল পরিধান করত। মেয়েরাই কেবলমাত্র হাতে শঙ্খের বালা
পরত এবং অনেকগুলো চুড়ি পরতে ভালবাসত। মণি-মুক্তা ও দামী সোনা-রূপার অলংকার
ধনীরা ব্যবহার করত। মেয়েরা নানাপ্রকার খোপা বাঁধত। পুরুষদের বাবড়ি চুল
কাঁধের উপর ঝুলে থাকত। কর্পুর, চন্দন প্রভৃতি প্রসাধন সামগ্রীর সহিত
বিভিন্ন সুগন্ধির ব্যবহার তখন খুব প্রচলিত ছিল। মেয়েদের সাজসজ্জায় আলতা,
সিঁদুর ও কুমকুমের ব্যবহারও তখন প্রচলিত ছিল। পুরুষেরা মাঝে মধ্যে কাঠের
খড়ম বা চামড়ার চটিজুতা ব্যবহার করত। তখন ছাতারও প্রচলন ছিল।
তখনকার দিনে নানা রকম খেলাধূলা ও আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা ছিল। পাশা ও দাবা
খেলা প্রচলিত ছিল। তবে নাচ- গান ও অভিনয়ের প্রচলন ছিল খুব বেশি। বীণা,
বাঁশি, মৃদঙ্গ, ঢাক, ঢোল, খোল, করতাল ইত্যাদি তো ছিলই, এমনকি মাটির
পাত্রকেও বাদ্যযন্ত্ররূপে ব্যবহার করা হতো। কুস্তি, শিকার, ব্যয়াম,
নৌকাবাইচ ও বাজিকরের খেলা পুরুষদের খুব পছন্দ ছিল। নারীদের মধ্যে উদ্যান
রচনা, জলক্রীড়া ইত্যাদি আমোদ-প্রমোদের প্রচলন ছিল।
অন্নপ্রাশন, বিয়ে, শ্রাদ্ধ ইত্যাদি সামাজিক আচার-আচরণ অনুষ্ঠান সে যুগেও
প্রচলিত ছিল। বারো মাসে তেরো পার্বণ অনুষ্ঠিত হতো। এ উপলক্ষে নানা প্রকার
আমোদ-উৎসবের ব্যবস্থা ছিল। প্রাচীনকালে বাংলায় বর্তমানকালের ন্যায়
ভ্রাতৃদ্বিতীয়া (ভাইফোঁটা), নবান্ন, রথযাত্রা, অষ্টমী স্নান, হোলি,
জন্মাষ্টমী, দশহরা, অক্ষয় তৃতীয়া, গঙ্গাস্নান প্রভৃতি সুপরিচিত
অনুষ্ঠানগুলো সেকালেও প্রচলিত ছিল। এসকল নানাবিধ আমোদ-উৎসব ছাড়াও
হিন্দুধর্মের অনেক লৌকিক অনুষ্ঠানও প্রাচীনকালের সমাজ জীবনে বিশিষ্ট স্থান
অধিকার করেছিল। শিশুর জন্মের পূর্বে তার মঙ্গলের জন্য গর্ভাধান,
সীমন্তোন্নয়ন ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হতো। জন্মের পর নামকরণ, অন্নপ্রাশন ইত্যাদি
উপাচার পালন করা হতো। প্রাচীনকালে বাংলার জনগণের দৈনন্দিন জীবনে
ধর্মশাস্ত্রের প্রবল প্রভাব ছিল। কোন্ তিথিতে কি কি খাদ্য নিষিদ্ধ, কোন্
তিথিতে উপবাস করতে হবে এবং বিবাহ, শিশু বয়সে পড়াশুনা শুরু করা, বিদেশ
যাত্রা, তীর্থযাত্রা প্রভৃতির জন্য কোন্ কোন্ সময় শুভ বা অশুভ ইত্যাদি
বিষয়ে নিয়ম কঠোরভাবে পালিত হতো।
প্রচীন বাংলার মানুষের যাতায়াতের প্রধান বাহন ছিল গরুর গাড়ি ও নৌকা।
খাল-বিলে চলাচলের জন্য ভেলা ও ডোঙ্গা ব্যবহার করত। মানুষ ছোট ছোট খাল পার
হতো সাঁকো দিয়ে। ধনী লোকেরা হাতী, ঘোড়া, ঘোড়ার গাড়ি প্রভৃতি যাতায়াতের জন্য
ব্যবহার করত। তাদের স্ত্রী-পরিজনেরা নৌকা ও পালকীতে একস্থান হতে অন্য
স্থানে আসা-যাওয়া করত। বিবাহের পর নববধূকে গরুর গাড়িতে বা পালকিতে করে
শ্বশুর বাড়ি আনা হত। মোটের উপর মনে হয় যে, আধুনিক কালের গ্রামীণ জীবনযাত্রা
এবং সেকালের জীবনযাত্রার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য ছিল না।
কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে বাংলার অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করত। মানুষের জীবন
মোটের উপর সুখের ছিল। তবে প্রাচীন বাংলার গরিব দুঃখী মানুষের কথাও জানা
যায়। সমাজের উঁচু শ্রেণি অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের হাতে ছিল মূল ক্ষমতা। এ সময়
শুধুমাত্র ব্রাহ্মণরাই শাস্ত্রজ্ঞান চর্চা করতে পারত। ব্রাহ্মণদের অত্যাচার
সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ট করে তুলেছিল। এ উৎপাত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের
প্রতি অধিক হতো। শেষ দিকের সেন রাজাদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অত্যন্ত
অসন্তুষ্ট হয়ে উঠে। সেন বংশের শাসনামলে বৌদ্ধ সমাজ ও সংস্কৃতিতে নেমে আসে
দুর্দশা। ব্রাহ্মণদের প্রভাবে সেনদের সময়ে সাধারণ হিন্দু সমাজ দুর্বল হয়ে
পড়ে। প্রাচীন বাংলার শেষ পর্যায়ে এ বিশৃঙ্খল অবস্থায় মুসলমান সমাজের ভিত
গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মুসলমান সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে বাংলায়
মধ্যযুগের সূচনা হয়। আর এ যুগে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির রূপও পাল্টে যায়।
প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা এবং শিল্পকলা ও স্থাপত্য-ভাস্কর্য
প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা
বাংলা চিরকালই কৃষি প্রধান দেশ। প্রাচীনকালে বাংলার অধিবাসীদের বেশির ভাগ
লোকই গ্রামে বাস করত। তারা সবাই মিলে একসাথে গ্রাম গড়ে তুলত। আর গ্রামের
আশপাশের ভূমি চাষ করে সংসার চালাতো। যারা চাষ করত বা অন্য কোন প্রকারে জমি
ভোগ করত, বিনিময়ে তাদের কতকগুলো নির্দিষ্ট কর দিতে হতো।
প্রধানত: তিন প্রকারের ভূমি ছিল। ঘর-বাড়ি তৈরি করে থাকার জন্য উপযুক্ত
জমিকে ‘বাস্তু’, চাষ করা যায় এমন উর্বর জমিকে ‘ক্ষেত্র’ এবং উর্বর অথচ পতিত
জমিকে বলা হতো ‘খিল’। এ তিন প্রকারের ভূমি ছাড়াও অন্যান্য প্রকারের ভূমি
ছিল। সেগুলো হলো- চারণ ভূমি, হাট-বাজার, অনুর্বর, বনজঙ্গল এবং যানবাহন
চলাচলের পথ। মনে করা হয় এ সময় ভূমির মালিক ছিলেন রাজা নিজে। তখনকার দিনে
‘নল’ দিলে জমি মাপা হতো। বিভিন্ন এলাকায় নলের দৈর্ঘ্য বিভিন্ন রকমের ছিল।
প্রাচীনকাল হতেই বঙ্গদেশ কৃষির জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। তাই এদেশের অর্থনীতি গড়ে
উঠেছে কৃষির উপর নির্ভর করে। ধান ছিল বাংলার প্রধান ফসল। এছাড়া পাট,
ইক্ষু, তুলা, নীল, সর্ষে ও পান চাষের জন্য বাংলার খ্যাতি ছিল। ফলবান
বৃক্ষের মধ্যে ছিল আম, কাঁঠাল, নারকেল, সুপারি, ডালিম, কলা, লেবু, ডুমুর,
খেজুর ইত্যাদি। এলাচি, লবঙ্গ প্রভৃতি মসলাও বঙ্গে উৎপন্ন হতো। গৃহপালিত
পশুর মধ্যে গরু, ছাগল, মেষ, হাঁস-মুরগি, কুকুর ইত্যাদি ছিল প্রধান। লবণ ও
শুটকি দেশের কোনো কোনো অংশে উৎপন্ন হতো।
কুটির শিল্পে প্রাচীন বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ছিল। গ্রামের লোকদের দরকারি সব
কিছু গ্রামেই তৈরি হতো। মাটির তৈরি জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল কলস, ঘটি-বাটি,
হাঁড়ি-পাতিল, বাসনপত্র ইত্যাদি। লোহার তৈরি জিনিসপত্রের মধ্যে ছিল দা,
কুড়াল, কোদাল, খন্তা, খুরপি, লাঙ্গল ইত্যাদি। এছাড়া জলের পাত্র, তীর,
বর্শা, তলোয়ার প্রভৃতি যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র তৈরি হতো। বিলাসিতার নানা রকম
জিনিসের জন্য স্বর্ণ-শিল্প ও মণি-মানিক্য শিল্প অনেক উন্নতি লাভ করেছিল।
কাঠের শিল্পও সে সময়ে অত্যন্ত উন্নত ছিল। সংসারের আসবাবপত্র, ঘর-বাড়ি,
মন্দির, পাল্কি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি, রথ প্রভৃতি কাঠের দ্বারাই তৈরি
হতো। এছাড়া নদীপথে চলাচলের জন্য নানা প্রকার নৌকা ও সমুদ্রে চলাচলের জন্য
কাঠের বড় বড় নৌকা বা জাহাজ তৈরি হতো।
বাংলাদেশ কৃষি প্রধান হলেও অতি প্রাচীনকাল হতে এখানে নানা প্রকার শিল্পজাত
দ্রব্য তৈরি হতো। বস্ত্র শিল্পের জন্য বাংলা প্রাচীনকালেই বিখ্যাত হয়ে
উঠেছিল। বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড় প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় তৈরি হতো। এ বস্ত্র
এত সূক্ষ্ম ছিল যে, ২০ গজ মসলিন একটি নস্যের কৌটায় ভরা যেত। কার্পাস তুলা ও
রেশমের তৈরি উন্নতমানের সূক্ষ্ম বস্ত্রের জন্যও বঙ্গ প্রসিদ্ধ ছিল।
কার্পাস তুলা ও শনের তৈরি মোটা কাপড়ও তখন প্রস্তুত হতো। জানা যায় যে,
বঙ্গদেশে সে সময় টিন পাওয়া যেত।
বঙ্গে কৃষি ও শিল্প দ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। আবার এগুলোর খুব চাহিদাও ছিল
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তাই বঙ্গের সঙ্গে
প্রাচীনকালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। বঙ্গের রপ্তানী
পণ্যের মধ্যে উলে- যোগ্য ছিল সূতি ও রেশমী কাপড়, চিনি, গুড়, লবণ, তেজপাতা ও
অন্যান্য মসলা, চাউল, নারকেল, সুপারি, ঔষধখ তৈরির গাছপালা, নানা প্রকার
হিরা, মুক্তা, পান্না ইত্যাদি।
শিল্পের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যও যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল।
স্থল ও জল উভয় পথেই বাণিজ্যের আদান-প্রদান চলত। দেশের ভেতরে বাণিজ্য ছাড়াও
সে সময়ে বাংলা বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশেষ উন্নত ছিল। স্থল ও জলপথে ভারতের
অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বাংলার পণ্য বিনিময় চলত। এ কারণে বাংলার বিভিন্ন
স্থানে বড় বড় নগর ও বাণিজ্য বন্দর গড়ে উঠেছিল। এগুলো হলো- নব্যাবশিকা,
কোটীবর্ষ, পুন্ড্রবর্ধন, তাম্রলিপ্ত, কর্ণসুবর্ণ, সপ্তগ্রাম ইত্যাদি। অবশ্য
শহর ছাড়া গ্রামের হাটবাজারেও কিছু কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। এসব গ্রামের
হাটে গ্রামে উৎপন্ন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেচা-কেনা হতো। সমুদ্র পথে
সিংহল, ব্রহ্মদেশ, চম্পা, কম্বোজ, যবদ্বীপ, মালয়, শ্যাম, সুমাত্রা, চীন
প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাংলার পণ্য বিনিময় চলত। স্থলপথে চীন, নেপাল, ভূটান,
তিব্বত ও মধ্য এশিয়া প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চলত।
শিল্পের উন্নতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে বাংলার ধন-সম্পদ ও ঔশ্বর্য
প্রচুর বেড়ে গিয়েছিল। প্রাচীনকালে হয়ত ক্রয়-বিক্রয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের
জন্য ‘বিনিময় প্রথা’ প্রচলিত ছিল। সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকের পূর্বে
বাংলায় মুদ্রার প্রচলন আরম্ভ হয়। বিভিন্ন সময়ে বঙ্গদেশে বিভিন্ন প্রকার
মুদ্রা চালু থাকলেও এখানে কড়ি সবচেয়ে কম মান হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
শিল্পকলা ও স্থাপত্য-ভাস্কর্য
বাংলাদেশের নানাস্থানে প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চিত্রশিল্পের
বহু নির্দশন পাওয়া গেছে। নানাবিধ কারণে প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা ধ্বংস হয়ে
গেছে। তবুও নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রাচীন যুগে বাংলার শিল্পকলা খুবই উন্নত
ছিল।
স্থাপত্য : প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন অতি সামান্যই আবিষ্কৃত
হয়েছে। চীন দেশের ভ্রমণকারী ফা-হিয়েন ও হিউয়েন-সাং- এর বিবরণী ও প্রাচীন
শিলালিপি থেকে প্রাচীন যুগে বাংলার কারুকার্যময় বহু হর্ম্য, (চূড়া, শিখা)
মন্দির, স্তূপ ও বিহারের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়।
ভারত উপ-মহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপত্যের নির্দশন হলো স্তূপ। বৈদিক যুগে
দেহাবশেষ পুঁতে রাখার জন্য শ্মশানের উপর মাটির স্তূপ রক্ষা করার জন্য এ
স্থাপত্য পদ্ধতিকে গ্রহণ করা হয়। বৌদ্ধধর্ম যেখানেই প্রসার লাভ করেছে,
সেখানেই ছোট-বড় অসংখ্য স্তূপ নির্মিত হয়েছে। প্রাচীন বাংলায় কিছু বৌদ্ধ ও
জৈন স্তূপ নির্মিত হয়েছিল। ঢাকা জেলার আশরাফপুর গ্রামে রাজা দেব খড়গের
ব্রোঞ্জ বা অষ্টধাতু নির্মিত একটি স্তূপ পাওয়া গেছে। এটিই সম্ভবত বাংলার
সবচেয়ে প্রাচীন স্তূপের নির্দশন। রাজশাহীর পাহাড়পুর এবং চট্টগ্রামের
ঝেওয়ারিতে আরও দুটি ব্রোঞ্জের তৈরি স্তূপ পাওয়া গেছে। এছাড়া, রাজশাহীর
পাহাড়পুর এবং বাঁকুড়ার বহুলাড়ায় বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইটের তৈরি স্তূপ পাওয়া
গেছে।
অতি প্রাচীনকাল হতে বাংলায় বৌদ্ধ ও জৈন ভিক্ষুরা বিহার ও সংঘরাম তৈরি করে
স্ব স্ব ধর্ম প্রচার করতেন। কিন্তু একে স্থাপত্য কর্ম বলা চলে না। কারণ,
ইট-পাথরের কাঠামোর উপর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে এগুলো তৈরি হতো। কালক্রমে বৌদ্ধ ও
জৈন সংঘে যখন প্রচারকের সংখ্যা বাড়তে লাগল তখন হতেই ইটের তৈরি বিহার
প্রস্তুত শুরু হলো। পাল যুগে এসেই বিহারের রূপের পরিবর্তন হলো। এসব বিহারের
কোনো কোনটি বেশ বড় এবং কারুকার্যময় ছিল। স্তূপের মত এগুলোও ধ্বংসপ্রাপ্ত
হয়ে গেছে। রাজশাহীর পাহাড়পুরে যে বিশাল বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে তা
প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এ পর্যন্ত ভারত
উপমহাদেশে যত বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে তারমধ্যে এ বিহারটি সবচেয়ে বড়। জানা
যায়, অষ্টম শতকে ধর্মপাল এখানে প্রকাণ্ড বিহারটি নির্মাণ করেন। ‘সোমপুর
বিহার’ নামে এটি সমগ্র ভারতবর্ষে ও ভারতবর্ষের বাইরে খ্যাতি অর্জন করে।
সোমপুর বিহার ব্যতীত ধর্মপাল বিক্রমশীল বিহার ও ওদন্তপুর বিহার নামে আরও
দুটি বিহার নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া পাল আমলে তৈরি ছোট-বড় আরও কয়েকটি
বিহারে নাম পাওয়া যায়। যেমন-মালদহের ‘জগদুল বিহার’, ‘দেবীকোট বিহার’,
চট্টগ্রামের ‘পণ্ডিত বিহার’, ত্রিপুরার ‘কনকস্তূপ বিহার’ প্রভৃতি। কয়েক বছর
পূর্বে কুমিল-র ময়নামতিতে কয়েকটি বিহারের সন্ধান পাওয়া গেছে। ইহা ‘শালবল
বিহার’ নামে পরিচিত।া কেহ কেহ মনে করেন যে, পাহাড়পুরের বিহার ও মন্দির
অপেক্ষাও বড় মন্দির ও বিহার এখানে ছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশের স্থাপত্যের ইতিহাসে প্রাচীন বাংলার মন্দির স্থাপনা
মর্যাদা ও স্বকীয়তায় এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। কারণ, প্রাচীনকালে এখানে
অসংখ্য মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এ সকল মন্দির আজ সকলই ধ্বংসপ্রাপ্ত
হয়েছে। কেবলমাত্র অষ্টম শতক হতে কটি ভাঙ্গা ও অর্ধ-ভাঙ্গা মন্দিরের নিদর্শন
পাওয়া যায়। এ সকল বৌদ্ধ মন্দির পুন্ড্রবর্ধন, সমতট, রাঢ়, বরেন্দ্র প্রভৃতি
অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। বর্ধমান জেলার বরাকরের মন্দিরটি প্রাচীন বাংলার
সবচেয়ে প্রাচীন মন্দির বলে ধারণা করা হয়। বাংলাদেশের স্থাপত্য শিল্পের
ইতিহাসে পাহাড়পুরের মন্দির এক অমর সৃষ্টি। এ উপমহাদেশের ইতিহাসে পাহাড়পুরের
মন্দিরের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, উপমহাদেশের অবশিষ্ট অঞ্চলের স্থাপত্য
শিল্পকে ইহা গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দিনাজপুর জেলার বাণগড়ে প্রস্তর
নির্মিত এবং চট্টগ্রামের কেওয়ারিতে ব্রোঞ্জের তৈরি মন্দির পাওয়া গেছে।
অতি সমপ্রতি ওয়ারী-বটেশ্বর গ্রামে প্রায় ২৫০০ বৎসরের পুরাতন এক
নগর-কেন্দ্রিক ধবংসাবশেষ পাওয়া গেছে। ইহা ঢাকা হতে ৭৫ কিলোমিটার দূরে
নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলায় অবস্থিত। এতদিন ধারণা করা হতো প্রাচীন বাংলার
সভ্যতা গ্রাম-কেন্দ্রিক। কিন্তু এ আবিষ্কারের ফলে এখন জোড়ালো ভাবেই বলা
যায় যে প্রাচীন বাংলায় নগর-কেন্দ্রীক সভ্যতাও গড়ে উঠেছিল।
ভাস্কর্য : খ্রিস্টাব্দের শুরুতে অথবা এর পূর্ব বর্ষ হতে বাংলায়
স্থাপত্য শিল্পের পাশাপাশি ভাস্কর্য শিল্পের চর্চাও হতো। প্রাচীন বাংলায়
বহু মন্দির ছিল। তাই ভাস্কর্য শিল্পকলাও যে উন্নত ছিল তাতে সন্দেহ নেই।
অনেক স্থানে মন্দির ধ্বংস হলেও তার মধ্যের দেবমূর্তি রক্ষিত হয়েছে।
কেবলমাত্র পুস্করণ, তমলুক, মহাস্থান প্রভৃতি অঞ্চলে গুপ্ত-পূর্ব যুগের
কয়েকটি পোড়ামাটির মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে।
পাহাড়পুরের মন্দির গাত্রে খোদিত পাথর ও পোড়ামাটির ফলক থেকে বাংলার নিজস্ব
ভাস্কর্য শিল্পের বৈশিষ্ট্যের পরিচয় পাওয়া যায়। বিষয়বস্তু ও শিল্প কৌশলের
দিক থেকে বিচার করলে পাহাড়পুরের ভাস্কর্য-শিল্পকে লোকশিল্প, অভিজাত শিল্প ও
দুয়ের মাঝামাঝি শিল্প কৌশল-এ তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। পাহাড়পুরের
ভাস্কর্যে রামায়ণ-মহাভারতের অনেক কাহিনী এবং কৃষ্ণলীলার অনেক কথা খোদিত
আছে। এছাড়া, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনেক কথাও এ ভাস্কর্যে রূপ
দেয়া হয়েছে। খোদিত ভাস্কর্য ছাড়াও প্রাচীন বাংলায় পোড়ামাটির শিল্প খুবই
উন্নত ছিল। কুমিল-র ময়নামতি ও লালমাই পাহাড়ে বেশ কিছু পোড়ামাটির ফলক ও
মূর্তি আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাচীনা কোটিবর্ষ নগরীর ধ্বংসস্তূপেও অনেকগুলো
পোড়ামাটির ফলক আবিষ্কৃত হয়েছে। পণ্ডিতগণ এগুলোকে মৌর্য, শূঙ্গ, কুষাণ,
গুপ্ত ও পাল যুগের বলে অনুমান করেছেন। গৌড়ের রাজধানী কর্ণসুবর্ণের
ধ্বংসাবশেষেও কিছু পোড়ামাটির মূর্তি পাওয়া গেছে।
চিত্রশিল্প : পাল যুগের পূর্বেকার কোনো চিত্র আজ পর্যন্ত পাওয়া
যায়নি। কিন্তু প্রাচীনকালেই বাংলায় যে চিত্র অঙ্কনের চর্চা ছিল তাতে কোনো
সন্দেহ নেই। সাধারণত: বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরের দেয়াল সৌন্দর্যময় করার জন্য
চিত্রাঙ্কন করার রীতি প্রচলিত ছিল।
তখনকার দিনে বৌদ্ধ লেখকেরা তালপাত্র অথবা কাগজে তাদের পুস্তকের পাণ্ডুলিপি
তৈরি করতেন। এ সকল পুঁথি চিত্রায়িত করার জন্য লেখক ও শিল্পীরা ছোট ছোট ছবি
আঁকতেন।
রেখার সাহায্যে চিত্রাঙ্কনেও প্রাচীন বাংলার শিল্পীরা যথেষ্ট দক্ষতা
দেখিয়েছেন। রাজা রামপালের রাজত্বকালে রচিত ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’
পুঁথি বাংলার চিত্র শিল্পের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। রেখার সাহায্যে চিত্রাঙ্কনের
আর একটি দৃষ্টান্ত হল সুন্দরবনে প্রাপ্ত ডোম্মনপালের তাম্রশাসনের অপর পিঠে
উৎকীর্ণ বিষ্ণুর রেখাচিত্র।
প্রাচীন বাংলার শিল্পকলার ক্ষেত্রে পাল যুগ স্মরণীয়। নবম থেকে দ্বাদশ শতক-এ
চার শতক পর্যন্ত এ যুগের শিল্পকে সাধারণত; পাল যুগের শিল্পকলা বলে
আখ্যায়িত করা হয়। কারণ, এ যুগের শিল্পনীতিই পরবর্তী সেন যুগেও অব্যাহত ছিল।
প্রস্তর ও ধাতু নির্মিত দেব-দেবীর মূর্তি এ যুগের শিল্পকলার শ্রেষ্ঠ
নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়। এতে ধর্মভাবের প্রভাবই ছিল বেশি। শাস্ত্রীয়
অনুশাসন অনুসারে দেব-দেবীর মূর্তিগুলো নির্মিত হয়েছিল। তথাপি শিল্পীর
শিল্পকৌশল ও সৌন্দর্যবোধের পরিচয় এতে লক্ষ্য করা যায়। মূর্তি নির্মাণে
সাধারণত অষ্টধাতু ও কালো কষ্টিপাথর ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া স্বর্ণ ও রূপার
ব্যবহারের প্রচলন ছিল।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য : উদ্ভব ও বিকাশ
আর্যদের প্রাচীন বাংলায় আগমনের পূর্বে এখানে নানা জাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর
লোক বসবাস করত। তারা আর্যভাষী হিন্দু ছিল না। কিন্তু তারা যে কোন ভাষায়
কথা বলত তা সঠিকভাবে আজও নির্ণয় করা যায়নি। গোষ্ঠী বিভাগের সঙ্গে মানব
জাতির ভাষা বিভাগের সংমিশ্রণ না ঘটিয়ে একথা বলা যায় যে, বাংলার প্রাচীন
অধিবাসীরা নানা ভাষা-ভাষী লোক ছিল না।
বাংলার প্রাচীনতম অধিবাসীরা সম্ভবত ছিল অস্ট্রিক গোষ্ঠীর অস্ট্রো-এশিয়াটিক
জাতির মানুষ। তারা ব্রহ্মদেশে (মায়ানমার) ও শ্যামদেশের (থাইল্যান্ড) মোন
এবং কম্বোজের হ্মের শাখার মানুষের আত্মীয়। এ জাতীয় মানুষকেই বোধ হয় বলা হতো
‘নিষাদ’ কিংবা ‘নাগ’; আর পরবর্তীকালে ‘কোল-, ‘ভিল- ইত্যাদি। তা হলে অনুমান
করা যেতে পারে যে,’’ তাদের ভাষাও ছিল অস্ট্রিক গোষ্ঠীর মোন, হ্মের শাখার
ভাষার মতোই। অনেকটা এরূপ ভাষায় এখনও কথা বলে বাংলাদেশের পশ্চিমে কোল,
মুন্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, আর বর্তমান আসাম রাজ্যের খাসিয়া
পাহাড়ের বাসিন্দারা। অস্ট্রিক গোষ্ঠী ছাড়াও বাংলায় বাস করত দ্রাবিড়
গোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখার লোক। তারা ছিল সুসভ্য জাতির মানুষ। তাদের প্রধান
বাসভূমি এখন দাক্ষিণাত্যে। কিন্তু এক সময় তারা সম্ভবত পশ্চিম-বাংলা ও
মধ্য-বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। অস্ট্রো-এশিয়াটিক ও দ্রাবীড় ভাষার লোকেরা ছাড়াও
পূর্ব ও উত্তর বাংলায় বহু পূর্বকাল হতে নানা সময়ে এসেছিল মঙ্গোলীয় বা ভোট
চীনা গোষ্ঠীর নানা জাতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোক। এরা হলো গাড়ো, বড়ো, কোচ,
মেছ, কাছাড়ি, টিপরাই, চাকমা প্রভৃতি। সম্ভবত এদেরই বলা হতো কিরাত জাতি। এরা
ভোটচীনা গোষ্ঠীর নানা ভাষা- উপভাষায় কথা বলত। এর কোনো কোনো শব্দ ও রচনা
পদ্ধতি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃত ভাষায় লুকিয়ে আছে এবং এর কিছু কিছু নিদর্শন
ভাষা বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পেরেছেন।
অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটচীনা ভাষাগোষ্ঠীর পর যে নতুন একটি ভাষা গোষ্ঠীর
মানুষ বাংলায় প্রবেশ করে তারা হলো আর্য। আর্যদের ভাষার নাম প্রাচীন বৈদিক
ভাষা। পরবর্তীকালে এ ভাষাকে সংস্কার করা হয়। পুরানো ভাষাকে সংস্কার করা হয়
বলে এ ভাষার নাম হয় সংস্কৃত ভাষা। সম্ভবত বৈদিক যুগের শেষ দিকে তারা বাংলায়
আগমন শুরু করে। আর খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের মধ্যে তারা এদেশে বসতি স্থাপন
শেষ করেছিল। ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো দীর্ঘদিন ধরে তারা
বাংলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে পাশাপাশি বসবাস করতো। ফলে, ক্ষুদ্র
নৃগোষ্ঠীর অধিবাসীরা
নিজেদের ভাষা ত্যাগ করে সম্পূর্ণভাবে আর্য ভাষা গ্রহণ করে। সুতরাং,
সর্বপ্রাচীন যুগে আর্যগণ যে ভাষা ব্যবহার করত এবং যে ভাষায় বৈদিক গ্রন্থ
রচিত হয়েছিল স্থানভেদে এবং সময়ের পরিবর্তনে এর অনেক পরিবর্তন ঘটে। সংস্কৃত
হতে প্রকৃত এবং প্রাকৃত হতে অপভ্রংশ ভাষার উৎপত্তি হয়। অপভ্রংশ ভাষা হতে
অষ্টম বা নবম শতকে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়। যেমন-
কৃষ্ণ>কাহ্ন>কানু>কানাই।
নয় ও দশ শতকের আগে বাংলা ভাষার রূপ কি ছিল তা জানবার কোন উপায় নেই। তবে এ
শতকগুলোতে বাংলায় সংস্কৃত ছাড়াও দুটো ভাষা প্রচলিত ছিল- এর একটি হলো
শৌরসেনী অপভ্রংশ এবং অন্যটি মাগধী অপভ্রংশের স্থানীয় গৌড়-বঙ্গীয় রূপ- যাকে
বলা যায় প্রাচীনতম বাংলা ভাষা। একই লেখক এ দু ভাষাতেই পদ, দোহা, ও গীত রচনা
করতেন। বাংলা ভাষার এরূপ প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
কর্তৃক নেপাল হতে সংগৃহীত চারটি প্রাচীন বৌদ্ধ পুঁথিতে। এগুলো ‘চর্যাপদ’
নামে পরিচিত। এখন পর্যন্ত মোট ৪৭টি চর্যাপদ পাওয়া গেছে। এ চর্যাপদগুলোর
মধ্যেই বাংলা সাহিত্যের জন্ম হয়। পরবর্তী যুগে বাংলায় সহজিয়া গান, বাউল গান
ও বৈষ্ণব পদাবলীর উৎপত্তি হয়। সুতরাং, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের
দিক থেকে এ চর্যাপদগুলোর মূল্য অপরিসীম। মোটামুটিভাবে বলা যায় যে, আট শতক
হতে বারো শতক পর্যন্ত এ পাঁচশত বছরই হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাচীন
যুগ।
প্রাচীন বাংলার সাংস্কৃতিক জীবন, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস
প্রাচীন বাংলার ধর্মীয় অবস্থা
প্রাচীন বাংলায় আর্য ধর্ম প্রতিষ্ঠার পূর্বে কোন্ ধর্ম প্রচলিত ছিল, সে
সম্পর্কে সঠিক কোন কিছু জানা যায় না। কারণ সে সকল আদিম অধিবাসীদের
ধর্ম-কর্মের ইতিহাস হলো জনপদবদ্ধ প্রাচীন বাংলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের
পূজা-অর্চনা, ভয়-ভক্তি, বিশ্বাস ও সংস্কারের ইতিহাস। তখন সমগ্র দেশব্যাপী
ধর্মের প্রকৃতি একই রকম ছিলনা। বরং বর্ণ, শ্রেণি, কৌম, জনপদ ইত্যাদির
বিভিন্নতার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ম-কর্মেও বিভিন্নতা দেখা দিয়েছিল। তদুপরি, তাদের
প্রাচীন ধর্মমত, সংস্কার, পূজা-পদ্ধতি প্রভৃতি রূপান্তরিত হয়ে আর্য ধর্মের
সঙ্গে মিলে গিয়েছে। এখনও বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে নারী জাতির মধ্যে
প্রচলিত বৃক্ষ পূজা, পূজা-পার্বণে আম্র পল- , ধান ছড়া, দুর্বা, কলা,
পান-সুপারি, নারকেল, ঘট, সিঁদুরব প্রভৃতির ব্যবহার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর
লোকদের দান। একইভাবে মনসা পূজা, শ্মশান কালীর পূজা, বণদূর্গাপূজা,
ষষ্টীপূজা প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানেরই পরিচয় বহন
করে। খাসিয়া, মুন্ডা, সাঁওতাল, রাজবংশী, বুনো, শবর প্রভৃতি কৌমের লোকেরা
তাদের আদিম পুরুষদের মতো আজও দেবতার আসনে বসিয়ে গাছ, পাথর, পাহাড়,
পশু-পক্ষী ও ফল-মূলের পূজা করে থাকে। প্রাচীন ভারতের মতো তখনকার দিনে এদেশে
নানা রকমের ধ্বজ পূজাও প্রচলিত ছিল। ধ্বজ পূজা ছিল কৌমের লোকদের নিকট
ঐক্যের প্রতীক।
খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক হতেই উপমহাদেশের তিনটি বৃহৎ ধর্ম-বৈদিক, বৌদ্ধ ও
জৈন ধর্মের প্রভাবে বাংলা পতিত হয়। বাংলায় গুপ্ত যুগের পূর্বে অবৈদিক আর্য
ধর্মের কিছুটা বিস্তার ঘটলেও খ্রিষ্টীয় তিন-চার শতক পর্যন্ত এখানে আর্য-
বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির কিছুই প্রসার লাভ করে নি। গুপ্ত আমলের তাম্রশাসন
হতে জানা যায় যে, মধ্যদেশ হতে এসে ব্রাহ্মণেরা বঙ্গদেশের নানা জায়গায় বসতি
স্থাপন করেছিল। তারা বৈদিক যাগ-যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান করতেন এবং বেদ আলোচনা
করতেন। তাদের ধর্ম-কর্ম পরিচালনা ও মন্দির নির্মাণের জন্য ভূমিদান করে
রাজা-মহারাজারা পূণ্য অর্জনের চেষ্টা করতেন। এভাবে ছয় শতকে বৈদিক ধর্ম ও
সংস্কৃতির ঢেউ বাংলার পূর্ব সীমানা পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
পাল শাসনের আমলেও বৈদিক ধর্মের প্রভাব প্রতিপত্তি অটুট ছিল। বর্ম ও সেন
রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে একাদশ ও দ্বাদশ শতকে বৈদিক ধর্ম আরও প্রসার লাভ
করে। এ দুই বংশের রাজা-মহারাজারা প্রায় সকলেই ব্রাহ্মণ্য ধর্মে বিশ্বাসী
ছিলেন। তখন বৌদ্ধ ধর্ম অনেকটা ম-ন হয়ে গিয়েছিল। বৈদিক যাগ-যজ্ঞে পৌরাণিক
দেব-দেবী ও বিশেষ বিশেষ তিথিা নক্ষত্রে স্নান-দান-ধ্যান-ক্রিয়াকর্মের
প্রচলন শুরু হয়। জাতকর্ম, নিষ্ক্রমণ, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়ান্তকরণ,
উপনয়ন, সমাবর্তন, বিবাহ, গৃহ প্রবেশ ইত্যাদি সংস্কার এভাবে বাঙালি
ব্রাহ্মণ্য সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। এসব সংস্কার দেশের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য
ব্রাহ্মণরা সরাসরি রাষ্ট্রের সহায়তা লাভ করেছিল।
বৈদিক ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম বাংলার বুকে খুব দ্রুত প্রসার লাভ করলেও কালক্রমে
এর মধ্যে বিবর্তন দেখা দেয়। গুপ্ত আমলে এদেশে একটি নতুন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের
আবির্ভাব ঘটে। বৈদিক যুগের দেব-দেবীর পরিচয় প্রায় বিলীন হয়ে যায়। তার
পরিবর্তে নতুন নতুন দেব-দেবীর পূজা শুরু হয়। এ সকল দেবতাদের নামের সঙ্গে
বৈদিক দেবতার নামের মিল ছিল। কিন্তু বৈদিক ক্রিয়াকান্ডের সঙ্গে তাদের কোনো
মিল ছিল না। এ নতুন দেব-দেবীরা ছিলেন মূলত পুরাণ ও মহাকাব্যে বর্ণিত
দেব-দেবী। তাই এ ধর্মকে ‘পৌরাণিক ধর্ম’ বলা হয়। স্থানীয় ধর্ম বিশ্বাসের
প্রভাবের ফলে আর্য ধর্মে এরূপ বিবর্তন দেখা দেয়। পুরোহিতরা ধর্ম-কর্ম
পরিচালনা করার সার্বিক দায়িত্ব লাভ করেন। ধর্মীয় ক্রিয়াকাণ্ডের জটিলতা বেড়ে
যায়। দেবতার বেদিতে দুধ ও ঘৃত উৎসর্গের পরিবর্তে পশুবলি প্রথা বৃদ্ধি পায়।
বিভিন্ন প্রকার কুসংস্কার ধর্মের অঙ্গ হিসেবে দেখা দেয়।
পাল পর্বে যে পৌরাণিক ধর্ম ও সংস্কারের বিস্তার দেখা যায়, সেন আমলে তা আরও
প্রসারিত হয়। সূর্য গ্রহণ, চন্দ্র গ্রহণ, উত্থান দ্বাদশী তিথি, উত্তরায়ন,
সংক্রান্তি ইত্যাদি উপলক্ষে স্নান, তর্পণ ও পূজা, সুখরাত্রি ব্রত, হোলাকা
বা বর্তমান কালের হোলি উৎসব, জন্মাষ্টমী, নীতি পাঠের অনুষ্ঠান প্রভৃতি
পৌরাণিক ক্রিয়া-কলাপ এ যুগে ব্যাপকভাবে দেখা যায়।
পৌরাণিক পূজা পার্বণের রীতি-নীতি ও ক্রিয়াকলাপ হতে যে সকল ধর্ম সমপ্রদায়ের
উদ্ভব হয় তাদের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা সর্বাপেক্ষা উলে- যোগ্য।
পাল-চন্দ্র-কম্বোজ যুগে বৈষ্ণব ধর্মের উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্নখ
লিপিমালায়। পাল রাজাদের অনেকে বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠাপোষক হলেও অন্য ধর্মের
ন্যায় বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কিন্তু সেন রাজাদের অবস্থা
ভিন্নতর। যদিও পূর্বপুরুষেরা সদাশিবের পূজা করতেন, তবু রাজা লক্ষণ সেন
ছিলেন ‘পরমবৈষ্ণব’। তাঁর সময় হতেই রাজকীয় শাসনের শুরুতে শিবের পরিবর্তে
বিষ্ণুর স্তবের প্রচলন হয়।
গুপ্তযুগে শৈব ধর্মও প্রচলিত ছিল। ষষ্ঠ শতকের গোঁড়ায় মহারাজ বৈন্যগুপ্তের
সহায়তায় পূর্ব বাংলায় শৈবধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। সপ্তম শতকে গৌড়রাজ শশাংক ও
কামরূপ রাজা ভাস্কর-বর্মা-দুজনেই ছিলেন পরম শৈব। লক্ষণ সেন ও তাঁর বংশধরগণ
বৈষ্ণব মতাবলম্বী হলেও কুলদেবতা সদাশিবকে কখনও পরিত্যাগ করেননি। আর্যাবর্তে
পাশুপত ধর্মাবলম্বীরা সবচেয়ে প্রাচীন শৈব সমপ্রদায়। পাল আমলে পাশুপত
সমপ্রদায়ও খুব শক্তিশালী ছিল।
এসকল দেব-দেবীর পূজা ব্যতীত অন্যান্য আরও অনেক পৌরাণিক দেব-দেবীর পূজা
বাংলায় প্রচলিত ছিল। এদের মধ্যে সূর্য ও শক্তি পূজাই ছিল সর্বাপেক্ষা উলে-
যোগ্য।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে জৈন ধর্মের প্রবর্তক বর্ধমান মহাবীর রাঢ় দেশে আগমন
করেছিলেন। কিন্তু সেখানকার লোকেরা তাঁর ধর্মকে গ্রহণ করেনি। বরং তাঁর সহিত
দুর্ব্যবহার করেছিল। তাই বলে জৈন ধর্মের অগ্রগতি রোধ করা যায়নি। প্রাচীনকাল
হতে এ সমপ্রদায়ের লোকেরা ‘নিগ্রহন্ত’ নামে পরিচিত হতো। গুপ্তযুগ পর্যন্ত এ
নাম বর্ধমান মহাবীরপ্রচলিত ছিল। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে উত্তর বঙ্গে জৈন
সমপ্রদায় বিদ্যমান ছিল। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে নাটোরের পাহাড়পুড়ে একটি জৈন
বিহার ছিল। সপ্তম শতকে উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব
বঙ্গে নিগ্রহন্ত জৈনদের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। সমতট ও পুন্ড্রবর্ধনে
তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তেরো শতকেও বাংলায় জৈন বা ‘নিগ্রহন্ত’ সংঘের
রীতিমতো অস্তিত্ব ছিল। তবে পাল যুগ শুরু হবার পর হতে জৈন ধর্মের প্রভাব কমে
এসেছিল।
প্রাচীন বাংলার ধর্ম জগতে বৌদ্ধ ধর্ম একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে।
বুদ্ধদেবের মৃত্যুর পর বাংলার কোথাও কোথাও বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়েছিল। অশোকের
রাজত্বকালেই বৌদ্ধ ধর্ম বাংলায় বেশি প্রসার লাভ করে। গুপ্ত ও গুপ্ত
পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম প্রসার লাভ না করলেও এর খুব তোড়জোড় ছিল। ষষ্ঠ
শতকের গোঁড়ার দিকে বাংলার পূর্বতম প্রান্ত ত্রিপুরায় মহাযান বৌদ্ধ ধর্ম
সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কুমিল- অঞ্চলে তখন অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার ছিল। পাল বংশের
আগমনেরা ফলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব খুব বৃদ্ধি পেয়েছিল। অষ্টম শতক
হতে একাদশ শতক পর্যন্ত বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মেরই জয়জয়কার ছিল। সুদীর্ঘ চারশত
বছরের রাজত্বকালে তাঁদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা-বিহার ছাড়িয়ে এ ধর্ম
আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। তাঁরা অনেক বৌদ্ধ-বিহার
নির্মাণ করেছিলেন।
এদের মধ্যে ধর্মপালের বিক্রমশীল মহাবিহার, সোমপুর বিহার ও ওদন্তপুর বিহার
সর্বাপেক্ষা উলে- যোগ্য। এ সকলখ বিহারে তিব্বত ও অন্যান্য অঞ্চল হতে অনেকে
বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য আগমন করতেন। সোমপুর বিহারে বাস করতেন
মহাপণ্ডিতাচার্য বোধিভদ্র। আচার্য অতীশ দীপঙ্করও কিছুকাল এ বিহারে বাস
করেছিলেন। বাংলা ছাড়াও রাঢ় অঞ্চল, বরেন্দ্র, দিনাজপুর, ত্রিপুরা, কুমিল- ও
চট্টগ্রামেও ছোট-বড় অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার ছিল। কয়েক বছর পূর্বো কুমিল-র
ময়নামতিতে কিছু সংখ্যক বিহারের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অত্যন্ত
বিশাল আকৃতির বিহারটিা ‘শালবন বিহার’ নামে পরিচিত। শ্রীভবদের ইহা নির্মাণ
করেছিলেন। পাল যুগের পর বাংলায় বৌদ্ধধর্ম সহজিয়া ধর্মরূপে জনপ্রিয় হয়ে
উঠেছিল। সমাজের নিম্ন স্তরে সহজিয়া ধর্মের খুব প্রভাব ছিল।
পাল রাজাদের মতো চন্দ্র বংশ ও কান্তিদেবের বংশের লোকেরাও বৌদ্ধ ছিলেন।
কিন্তু সেন রাজাগণের আগমনের পর বাংলায় শৈব ও বৈষ্ণব ধর্ম এবং প্রাচীন বৈদিক
ও পৌরাণিক ধর্মানুষ্ঠান ও আচার-ব্যবহার পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়।
সেন যুগেই বিষ্ণু, শিব, পার্বতী প্রভৃতি দেব-দেবীর পূজা শুরু হয় এবং বহু
হিন্দু মন্দির নির্মিত হয়। ফলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের পতন শুরু হয়। তারপর শেষ
আঘাত আসে তুর্কী মুসলমানদের নিকট হতে। দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে তুর্কী
আক্রমণের ফলে যখন প্রথমে মগধ ও পরে উত্তর বাংলার বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলো
ধ্বংস হয়, তখনই বৌদ্ধসংঘ ভারতের পূর্বপ্রান্তের এ সর্বশেষ আশ্রয় স্থান হতে
বিতাড়িত হয়ে আত্মরক্ষার জন্য নেপাল ও তিব্বতে গমন করে। বৌদ্ধসংঘই ছিল বৌদ্ধ
ধর্মের প্রধান কেন্দ্র। কাজেই বৌদ্ধ সংঘের সঙ্গে সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মও বাংলা
তথা ভারতবর্ষ হতে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
প্রাচীন বাংলায় বৈদিক, পৌরাণিক, জৈন, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী
সমপ্রদায় বর্তমান থাকলেও এদের মধ্যে কলহ ও হিংসা-দ্বেষ ছিল না। তারা পরস্পর
মিলেমিশে পাশাপাশি বসবাস করত। বিশেষ করে পালরাজগণ বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক
হয়েও অন্যান্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। প্রাচীন বাংলায় একমাত্র
শশাংকের পরধর্ম বিদ্বেষের কাহিনী আছে। অবশ্য এর সত্যতা সম্পর্কে যথেষ্ট
সন্দেহ আছে। চীনা এবং তিব্বতীয় তথ্য হতে জানা যায় যে, প্রাচীন যুগে বাংলার
ধর্ম জীবন খুব উন্নত ছিল এবং পরধর্ম সহিষ্ণুতা বাঙালি চরিত্রের অন্যতম
বৈশিষ্ট্য ছিল।
প্রাচীন বাংলার আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব ও রীতি-নীতি
প্রাচীন বাংলায় পূজা-পার্বন ও আমোদ প্রমোদের প্রচুর ব্যবস্থা ছিল। উমা
অর্থাৎ দূর্গার অর্চনা উপলক্ষে বরেন্দ্রে বিপুল উৎসব হতো। বিজয়া দশমীর দিন
‘শাবোরৎসব’ নামে একপ্রকার নৃত্যগীতের অনুষ্ঠান হতো।
চৈত্র মাসে বাদ্য সহকারে এক ধরনের অশ-ল গানের রীতি তখন প্রচলিত ছিল। হোলাকা
বা বর্তমান কালের ‘হোলি’ী একটি প্রধান উৎসব ছিল। স্ত্রী-পুরুষ সকলে এতে
যোগদান করতো। কোজাগরী পূর্ণিমা রাত্রিতে অক্ষ-ক্রীড়া হতো। আত্মীয়-স্বজন
মিলে চিড়া ও নারকেলের প্রস্তুত নানাবিধ খাদ্য গ্রহণ সে রাত্রির প্রধান অঙ্গ
ছিল। দ্যুত-পতিপদ নামে একটি বিশেষ উৎসব কার্তিক মাসের শুক্লা প্রতিপদে
অনুষ্ঠিত হতো। এ মাসেই সুখরাত্রিব্রত পালিত হতো। ভ্রাতৃদ্বিতীয়া,
আকাশপ্রদীপ, জন্মাষ্টমী, অক্ষয় তৃতীয়া, দশহরা, গঙ্গাস্নান, মহাঅষ্টমীতে
ব্রহ্মপুত্র স্নান ইত্যাদি বর্তমানের সুপরিচিত অনুষ্ঠানগুলো সেকালেও
প্রচলিত ছিল।
এ সকল পূজা-পার্বণে অনুষ্ঠিত নানাবিধ আমোদ-উৎসব ব্যতীত হিন্দুধর্মের অনেক
লৌকিক অনুষ্ঠানও প্রাচীনকালের সামাজিক জীবনে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছিল।
শিশুর জন্মের পূর্বে তার মঙ্গলের জন্য গর্ভাধান, পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন ও
শোষ্যন্তীহোম অনুষ্ঠিত হতো। জন্মের পর জাতকর্ম, নিষ্ক্রমণ, নামকরণ,
পৌষ্টিককর্ম, অন্নপ্রাশন ও আরও অনেক উপাচার পালন করা হতো।
বাংলার হিন্দুদের দৈনন্দিন জীবনে ধর্মশাস্ত্রের প্রবল প্রভাব ছিল। কোন্
তিথিতে কি কি খাদ্য ও কর্ম নিষিদ্ধ, কোন্ তিথিতে উপবাস করতে হবে এবং
বিবাহ, অধ্যয়ন, বিদেশ যাত্রা, তীর্থ গমন প্রভৃতির জন্য কোন্ কোন্ কাল শুভ
বা অশুভ সে বিষয়ে শাস্ত্রের অনুশাসন কঠোরভাবে পালিত হতো।
তখনকার দিনে বাঙালি পুরুষদের কোনো সুনাম ছিল না। বরং তারা বিবাদপ্রিয় ও
উদ্ধত বলে পরিচিত ছিল। কিন্তু বাঙালি মেয়েদের সুখ্যাতি ছিল। মেয়েরা
লেখাপড়াও শিখত। শিক্ষিত সমাজে মাতা ও পত্নীর সম্মান ও মর্যাদা বেশ উচ্চ
ছিল। সে যুগে অবরোধ বা পর্দা প্রথা ছিল না। বাংলার মেয়েদের কোনো
স্বাতন্ত্র্য বা স্বাধীনতা ছিল না। একটি মাত্র স্ত্রী গ্রহণই ছিল সাধারণ
নিয়ম। তবে পুরুষের মধ্যে বহু বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। অনেক স্ত্রীকেই
সপত্নীর সঙ্গে একত্রে জীবন যাপন করতে হত। বিধবা নারী জীবনের চরম অভিশাপ বলে
বিবেচিত হত। মুছে যেত কপালের সিঁদুর এবং সেই সঙ্গে তার সমস্ত প্রসাধন ও
অলঙ্কার। বিধবাকে নিরামিষ আহার করে সব ধরনের বিলাস বর্জন ও কৃচ্ছ্র সাধন
করতে হতো। সহমরণ প্রথা সেকালেও প্রচলিত ছিল। অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যু হলে একই
চিতায় স্ত্রীকেও জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো। প্রাচীন বাংলায় ধন-সম্পত্তিতে
নারীদের কোনো বিধিবিধানগত অধিকার ছিল না। তবে, স্বামীর অবর্তমানে অপুত্রক
বিধবা স্ত্রী স্বামীর সমস্ত সম্পত্তির অধিকার দাবি করতে পারত।
বাংলার প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রে নৈতিক জীবনের খুব উচ্চ আদর্শের পরিচয় পাওয়া
যায়। একদিকে সত্য, শৌচ, দয়া, দান প্রভৃতি সর্ববিধ গুণের মহিমা কীর্তন করা
হয়েছে। অপরদিকে, ব্রহ্ম হত্যা, সুরা পান, চুরি করা, পরদার গমন (পরস্ত্রীর
নিকট গমন) প্রভৃতি মহাপাতক বলে গণ্য করে তার জন্য কঠোর শাস্তি ও গুরুতর
প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে এ আদর্শ কি পরিমাণে
অনুসরণ করা হতো তা বলা কঠিন। তবে সমাজ জীবনে কিছু কিছু দুর্নীতি ও অশ-লতার
প্রমাণ পাওয়া যায়।
এই ব্লগের লেখাসমূহ সরাসরি বোর্ড বই থেকে উদ্ধৃত এবং Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License এর আওতায় প্রকাশিত।
এই ব্লগের লেখাসমূহ সরাসরি বোর্ড বই থেকে উদ্ধৃত এবং Creative Commons Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License এর আওতায় প্রকাশিত।
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস
(১২০৪ খ্রিঃ-১৭৫৭ খ্রিঃ)
বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনাকালকে বাংলায় মধ্যযুগের শুরু বলা হয়। ইতিহাসে
এক যুগ থেকে অন্য যুগে প্রবেশ করতে হলে বিশেষ কতকগুলো যুগান্তকারী পরিবর্তন
দরকার। মুসলমানদের বঙ্গ বিজয়ের ফলে বঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই শুধু
পরিবর্তন আসেনি। এর ফলে বঙ্গের সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, ভাষা ও সাহিত্য,
শিল্পকলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ দেশবাসীর জীবনে বৈপ-বক পরিবর্তন আসে।
বাংলায় মুসলমান শাসনের সূচনা
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি
তেরো শতকের শুরুতে তুর্কী বীর ইখতিয়ারউদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলার
উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাংশে সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলমান শাসনের সূচনা
করেন। তিনি আফগানিস্তানের গরমশির বা আধুনিক দশত-ই-মার্গের অধিবাসী ছিলেন।
ইতিহাসে তিনি বখতিয়ার খলজি নামেই বেশি পরিচিত। তাঁর বংশ পরিচয় সম্বন্ধে
তেমন কিছু জানা যায় না। তিনি ছিলেন জাতিতে তুর্কী, বংশে খলজি এবং বৃত্তিতে
ভাগ্যান্বেষী সৈনিক।
বখতিয়ার খলজি স্বীয় কর্মশক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ১১৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি
নিজ জন্মভূমির মায়া ত্যাগ করে জীবিকার অন্বেষণে গজনীতে আসেন। এখানে তিনি
শিহাবউদ্দিন ঘোরীর সৈন্য বিভাগে চাকরি প্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। খাটো, লম্বা
হাত ও কুৎসিত চেহারার জন্য নিশ্চয়ই বখতিয়ার সেনাধ্যক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণে
ব্যর্থ হন। এরূপ শারীরিক বৈশিষ্ট্য তুর্কীদের নিকট অমঙ্গল বলে বিবেচিত হতো।
গজনীতে ব্যর্থ হয়ে বখতিয়ার দিল-তে সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবেকেরী দরবারে
উপসিথত হন। এবারও তিনি চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। এরপর তিনি বদাউনে যান।
সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবরউদ্দিন তাকে মাসিক বেতনে সৈন্য বিভাগে
নিযুক্ত করেন। কিনু্ত উচ্চাভিলাষী বখতিয়ার এ ধরনের সামান্য বেতনভোগী
সৈনিকের পদে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে
অযোধ্যা যান। সেখানকার শাসনকর্তা হুসামউদ্দীনের অধীনে তিনি পর্যবেনের
দায়িত্বে নিযুক্ত হন। বখতিয়ারের সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে
হুসামউদ্দীন তাকে বর্তমান মির্জাপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভাগবত ও ভিউলি
নামক দুটি পরগনার জায়গীর দান করেন। এখানে বখতিয়ার তাঁর ভবিষ্যৎ উন্নতির
উৎস খুঁজে পান। ভাগবত ও ভিউলি তার শক্তিকেন্দ্র হয়ে উঠে।
বখতিয়ার অল্পসংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হিন্দু
রাজ্য আক্রমণ ও লুণ্ঠন করতে শুরু করেন। এ সময়ে তার বীরত্বের কথা চারদিকে
ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ভাগ্যান্বেষী মুসলমান তার সৈন্যদলে যোগদান করে। ফলে
বখতিয়ারের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এভাবে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আক্রমণ
চালিয়ে তিনি দক্ষিণ বিহারে এক প্রাচীর ঘেরা দুর্গের মতো স'ানে আসেন এবং
আক্রমণ করেন। প্রতিপক্ষ কোনো বাঁধাই দিল না। দূর্গ জয়ের পর তিনি দেখলেন যে
দূর্গের অধিবাসীরা সকলেই মুন্ডিত মস্তক এবং দূর্গটি বইপত্রে ভরা। জিজ্ঞাসা
করে তিনি জানতে পারলেন যে, তিনি এক বৌদ্ধ বিহার জয় করেছেন। এটি ছিল ওদন্দ
বিহার বা ওদন্তপুরী বিহার। এ সময় হতেই মুসলমানেরা এ স'ানের নাম দিল বিহার।
আজ পর্যন্ত তা বিহার নামে পরিচিত।
বিহার বিজয়ের পর বখতিয়ার অনেক ধনরত্নসহ দিল-র সুলতান কুতুবউদ্দীন আইবকের
সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সুলতানী কর্তৃক সম্মানিত হয়ে তিনি বিহার ফিরে আসেন।
অধিক সৈন্য সংগ্রহ করে তিনি পরের বছর নবদ্বীপ বা নদিয়া আক্রমণ করেন। এ সময়
বাংলার রাজা লক্ষণ সেন নদিয়ায় অবস'ান করছিলেন। গৌড় ছিল তাঁর রাজধানী, আর
নদিয়া ছিল তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী। বখতিয়ার কর্তৃক বিহার জয়ের পর সেন
সাম্রাজ্যে গভীর ভীতি বিদ্যমান ছিল। দৈবজ্ঞ, পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণগণ রাজা
লক্ষণ সেনকে রাজধানী ত্যাগ করতে পরামর্শ দেন। তাদের শাস্ত্রে তুর্কী সেনা
কর্তৃক বঙ্গ জয়ের সুস্পষ্ট ইঙ্গিতে আছে। এছাড়া বিজয়ীর যে বর্ণনা শাস্ত্রে
আছে তার সঙ্গে বখতিয়ারের দেহের বর্ণনা একেবারে মিলে যায়। কিন্তু তবুও রাজা
লক্ষণ সেন নদিয়া ত্যাগ করেননি। বিহার হতে বাংলায় প্রবেশ করতে হলে তেলিয়াগড় ও
শিকড়িগড় এই দুই গিরিপথ দিয়ে আসতে হতো। এ গিরিপথ দুটো ছিল সুরক্ষিত। তিনি
প্রচলিত পথে অগ্রসর হলেন না। কিন্তু অরণ্যময় অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর
হওয়াতে বখতিয়ারের সৈন্যদল খণ্ড খণ্ডভাবে অগ্রসর হয়। শত্রুপক্ষের দৃষ্টি
এড়িয়ে বখতিয়ার খলজি যখন নদীয়ার দ্বারপ্রান্তে উপসি'ত হলেন, তখন তাঁর সঙ্গে
ছিল মাত্র ১৭ কিংবা ১৮ জন অশ্বারোহী সৈনিক। এত অল্পসংখ্যক সৈন্য নিয়ে
বখতিয়ার খলজির পক্ষে বঙ্গ বিজয় কী করে সম্ভব হলো? কথিত আছে, তিনি এত
ক্ষিপ্র গতিতে পথ অতিক্রম করেছিলেন যে, মাত্র ১৭/১৮ জন সৈনিক তাঁকে অনুসরণ
করতে পেরেছিল। আর মূল সেনাবাহিনীর বাকি অংশ তাঁর পশ্চাতেই ছিল ।
তখন দুপুর। রাজা লক্ষণ সেন মধ্যাহ্নভোজে ব্যস্ত; প্রাসাদ-রক্ষীরা তখন আরাম
আয়েস করছে; নাগরিকগণও নিজেদের প্রাত্যহিক কাজে ব্যস্ত। বখতিয়ার খলজি বণিকের
ছদ্মবেশে নগরীর দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছান। রাজা লক্ষণ সেন তাদেরকে অশ্ব
ব্যবসায়ী মনে করে নগরীর অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি দেন। কিন্তু এ ক্ষুদ্রদল
রাজপ্রাসাদের সম্মুখে এসে হঠাৎ তরবারি উন্মুক্ত করে প্রাসাদ রক্ষীদের
হত্যা করে। অকস্মাৎ এ আক্রমণে চারদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়। প্রাসাদ অরক্ষিত রেখে
সকলে প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে বখতিয়ারের দ্বিতীয় দল নগরের মধ্যে এবং
তৃতীয় দল তোরণ- দ্বারে এসে উপসি'ত হয়। সমস্ত নগরী তখন প্রায় অবরুদ্ধ।
নাগরিকগণ ভীত ও সন্ত্রস্ত। এ অবস'ায় রাজা লক্ষণ সেন হতাশ হয়ে পড়েন। শত্রুর
আক্রমণ হতে আত্মরক্ষার কোনো উপায় নাই দেখে তিনি পিছনের দরজা দিয়ে সপরিবারে
খালি পায়ে গোপনে নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গে মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে আশ্রয়
গ্রহণ করেন। অল্পকালের মধ্যে বখতিয়ার খলজীর পশ্চাৎগামী অবশিষ্ট সৈন্যদলও
এসে উপসি'ত হলো। বিনা বাধায় নদিয়া ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে
আসে। বখতিয়ার খলজির নদিয়া জয়ের সঠিক তারিখ সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মধ্যে
মতভেদ আছে। তবে বর্তমানে ১২০৪ খ্রিস্টাব্দই নদিয়া জয়ের তারিখ হিসেবে
স্বীকৃতি পেয়েছে।
অতঃপর বখতিয়ার নদিয়া ত্যাগ করে লক্ষণাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসর হন। তিনি
লক্ষণাবতী অধিকার করে সেখানেই রাজধানী স'াপন করেন। এ লক্ষণাবতীই মুসলমান
আমলে লখনৌতি নামে পরিচিত হয়। গৌড় জয়ের পর বখতিয়ার আরও পূর্ব দিকে অগ্রসর
হয়ে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার বিস্তার করেন। এখানে উলে- ্য যে,
বখতিয়ারখ খলজি নদীয়া ও গৌড় বিজয়ের পর একটি স্বাধীন রাজ্যের অধিপতি হলেও
তিনি সমগ্র বাংলায় আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি। পূর্ববঙ্গে লক্ষণ সেনের
অধিকার অক্ষুণ্ন ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বংশধরেরা আরও কিছুদিন পূর্ব
বঙ্গ শাসন করেছিলেন।
গৌড় বা লখনৌতি বিজয়ের দুই বছর পর বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযানে বের হন। এ
তিব্বত অভিযানই ছিল তাঁর জীবনের শেষ সমর অভিযান। কিন্তু তাঁর এ অভিযান
ব্যর্থ হলে তিনি দেবকোটে ফিরে আসেন। এখানে তিনি অসুস' হয়ে পড়লে ১২০৬
খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। অনুমান করা হয় আলী মর্দান নামে একজন
আমীর তাকে হত্যা করেছিল।
বাংলায় মুসলমান শাসনের ইতিহাসে ইখতিয়ারউদ্দীন মুহম্মদ বিন-বখতিয়ার খলজির
নাম সর্বপ্রথম উলে- যোগ্য। তাঁরখ প্রচেষ্টার ফলেই এদেশে প্রথম মুসলমানদের
শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ শাসন প্রায় সাড়ে পাঁচশত বছরের অধিককাল স'ায়ী হয়েছিল
(১২০১-১৭৫৭ খ্রি:)। রাজ্য জয় করেই বখতিয়ার খলজি ক্ষান্ত ছিলেন না। বিজিত
অঞ্চলে তাঁর শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যও তিনি যথাযথ ব্যবস'া গ্রহণ
করেছিলেন। ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান সংস্কৃতি বিকাশের জন্য তাঁর ভূমিকা ছিল
উলে- যোগ্য। তাঁর শাসনকালে বহু মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদ ইত্যাদি নির্মিত
হয়েছিল।
বাংলায় তুর্কী শাসনের ইতিহাস
বাংলায় মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনা করেন বখতিয়ার খলজি। এ পর্বের প্রথম
পর্যায় ছিল ১২০৪ থেকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এ যুগের শাসনকর্তাদের
পুরোপুরি স্বাধীন বলা যাবে না। এঁদের কেউ ছিলেন বখতিয়ারের সহযোদ্ধা খলজী
মালিক। আবার কেউ কেউ তুর্কী বংশের শাসক। শাসকদের সকলেই দিলি- সুলতানদের
অধীনে বাংলারর শাসনকর্তা হয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীকালে অনেক শাসনকর্তাই দিলি-
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে চেয়েছেন।র তবে এদের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত
সফল হয়নি। দিলি- আক্রমণের মুখে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। মুসলিম
শাসনেরর এযুগ ছিল বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলায় পূর্ণ। তাই ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন
বারানী বাংলাদেশের নাম দিয়েছিলেন ‘বুলগাকপুর’। এর অর্থ ‘বিদ্রোহের নগরী’।
বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর পর তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে শুরু হয় ক্ষমতার
দ্বন্দ্ব। তাঁর সহযোদ্ধা তিনজন খলজী মালিকের নাম জানা যায়। এরা হচ্ছেন-
মুহম্মদ শিরণ খলজি, আলী মর্দান খলজী এবং হুসামউদ্দীন ইওয়াজ খলজি। অনেকেরই
ধারণা ছিল আলী মর্দান খলজি বখতিয়ার খলজির হত্যাকারী। এ কারণে খলজি আমীর ও
সৈন্যরা তাঁদের নেতা নির্বাচিত করেন মুহম্মদ শিরন খলজিকে। তিনি কিছুটা
শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। আলী মদার্ন খলজিকে বন্দী করা হয়। পরে আলী
মদার্ন পালিয়ে যান এবং দিলি- সুলতান কুবুতউদ্দিনের সহযোগিতা লাভ করেন। শিরন
খলজিরর শাসনকাল মাত্র একবছর স'ায়ী ছিল। এরপর ১২০৮ খ্রিস্টাব্দে দেবকোটের
শাসনকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খলজি। দিলি- সহযোগিতায়
দুই বছর পর ফিরে আসেন আলী মর্দান খলজি। ইওয়াজ খলজির স্বেচ্ছায় তাঁর হাতে
ক্ষমতা ছেড়ে দেন। আলী মর্দান খলজি ১২১০ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন
এবং নিজের নাম নেন আলাউদ্দিন আলী মদার্ন খলজী। খুব কঠোর শাসক ছিলেন তিনি।
তাই তাঁর বিরুদ্ধে ক্রমে বিক্ষোভ বাড়তে থাকে। খলজি মালিকরা এক জোট হয়ে
বিদ্রোহ করেন। এদের হাতে নিহত হন আলী মদার্ন খলজি। ইওয়াজ খলজি দ্বিতীয় বার
ক্ষমতায় আসেন। তিনি এ পর্যায়ে গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি নাম নিয়ে স্বাধীন
সুলতান হিসাবে বাংলা শাসন করেন। ১২১২ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায়
১৫ বছর তিনি বাংলার সুলতান ছিলেন।
সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজি
সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজি নিঃসন্দেহে খলজি মালিকদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ
ছিলেন। বখতিয়ার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বাংলার মুসলমান রাজ্যকে শক্তিশালী ও
সুদৃঢ় করতে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন। শাসনকার্যের সুবিধার জন্য তিনি রাজধানী
দেবকোট হতে গৌড় বা লখনৌতিতে স'ানান-রিত করেন। রাজধানীর প্রতিরক্ষা ব্যবস'া
সুদৃঢ় করার জন্য বসনকোট নাম স'ানে একটি দুর্গ নির্মাণ করা হয়। লখনৌতি নদী
তীরে অবসি'ত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা ছিল। তাছাড়া, ইওজ খলজি বুঝতে
পেরেছিলেন যে শক্তিশালী নৌ-বাহিনী ছাড়া শুধু অশ্বারোহী বাহিনীর পক্ষে
নদীমাতৃক বাংলায় রাজ্য সমপ্রসারণ সম্ভব হবে না। বাংলার শাসন বজায় রাখতে
হলেও নৌ-বাহিনীর প্রয়োজন ছিল। তাই বলা যায় যে, বাংলায় মুসলমান শাসকদের
মধ্যে ইওজ খলজিই নৌ-বাহিনীর গোড়াপত্তন করেছিলেন। রাজধানীর নিরাপত্তার জন্য
এর তিন পার্শ্বে গভীর ও প্রশস- পরিখা নির্মাণ করা হয়। বার্ষিক বন্যার হাত
হতে লখনৌতি ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য তিনি বহু খাল খনন ও
সেতু নির্মাণ করেন। তিনি রাস-া নির্মাণ করে সৈন্য ও পণ্য চলাচলের
সুবন্দোবস- করেন। এ রাজপথ নির্মাণের ফলে রাজ্য শাসন ও ব্যবসা - বাণিজ্যেরই
শুধু সুবিধা হয়নি, ইহা দেশের লোকের নিকট আশীর্বাদস্বরূপও ছিল। কারণ, ইহা
বার্ষিক বন্যার কবল হতে তাদের গৃহ ও শস্যক্ষেত্র রক্ষা করত।
উপরোক্ত কার্যাবলী গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজিকে একজন সুশাসক হিসেবে প্রতিপন্ন
করে। তিনি রাজ্য বিস-ারের দিকেও মনোনিবেশ করেন। পার্শ্ববর্তী হিন্দু
রাজারা, যেমন⎯ কামরূপ, উড়িষ্যা, বঙ্গ (দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) এবং ত্রিহুতের
রাজারা তাঁর নিকট কর পাঠাতে বাধ্য হন। লখনৌতির দক্ষিণ সীমানে-র লাখনোর শহর
শত্রুর কবলে পড়লেও পরে তিনি তা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন। আব্বাসীয় খলিফা
আল-নাসিরের নিকট হতে সুলতান গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজি স্বীকৃতিপত্র লাভ
করেছিলেন। তখন কোনো মুসলিম শাসক খলিফার স্বীকৃতিপত্র বা ফরমান না পেলে
ইসলামে তাকে বৈধ শাসক বলে স্বীকার করা হতো না।
দিল-র সুলতান ইলতুৎমিশ গিয়াসউদ্দীন ইওজ খলজির অধীনে লখনৌতির মুসলমান
রাজ্যের প্রতিপত্তি বিস-ার কখনওী ভালো চোখে দেখেননি। কিন্তু রাজত্বের
প্রারম্ভে আশু বিপদ ও সমস্যার সমাধান করার পূর্বে বাংলার দিকে নজর দেয়া
তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। ১২২৪ খ্রিস্টাব্দে বিপদসমূহ দূর হলে সুলতান
ইলতুৎমিশ বাংলার দিকে দৃষ্টি দেন। ১২২৫ খ্রিস্টাব্দে মুঙ্গের কিংবা
শকর্ীগলি গিরিপর্বতের নিকট উভয় সৈন্যদল মুখোমুখি হলে ইওজ খলজি সন্ধির
প্রস-াব করেন। উভয়পক্ষে এক সন্ধি হয়। ইলতুৎমিশ খুশি হয়ে মালিক আলাউদ্দীন
জানিকে বিহারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে এবং ইওজ খলজিকে বঙ্গের শাসক পদে বহাল
রেখে দিল-তে ফিরে যান। কিন' সুলতান দিল-তে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গেীী সঙ্গে
ইওজ খলজি পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বিহার আক্রমণ করে সেখানকার
শাসনকর্তা আলাউদ্দীন জানীকে বিতাড়ন করা হয়।
ইওজ খলজি লখনৌতি ফিরে এসেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ইলতুৎমিশ আবার বাংলা আক্রমণ
করবেন। তিনি প্রায় এক বছরকাল প্রস'তি নিয়ে রাজধানীতে অবস'ান করেন এবং
পাল্টা আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করেন। এ সময় দিল-রী রাজকীয় বাহিনী অযোধ্যার
বিদ্রোহ দমনে ব্যস- হয়ে পড়ে। ইওজ খলজি মনে করলেন এ অবস'ায় দিল- বাহিনীরী
পক্ষে বাংলা আক্রমণ করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি এ অবসরে পূর্ববঙ্গ আক্রমণ
করার মনস' করেন। রাজধানী লক্ষনৌতি একপ্রকার অরক্ষিত অবস'ায় ছিল। এদিকে
সুলতান ইলতুৎমিশ পুত্র নাসিরউদ্দীন মাহমুদকে লখনৌতি আক্রমণের নির্দেশ দেন।
ইওজ খলজির অনুপসি'তির সুযোগ নিয়ে নাসিরউদ্দীন মাহমুদ বঙ্গের রাজধানী লখনৌতি
আক্রমণ করেন। এ সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে ইওজ খলজি অতি অল্প সংখ্যক সৈন্য
সঙ্গে নিয়ে রাজধানীতে তাড়াতাড়ি ফিরে আসেন। শত্রুবাহিনী পূর্বেই তাঁর বসনকোট
দুর্গ অধিকার করেছিল। যুদ্ধে ইওজ খলজি পরাজিত ও বন্দী হন। পরে তাঁকে হত্যা
করা হয়। ইওজ খলজির পরাজয় ও পতনের ফলে বঙ্গদেশ পুরোপুরিভাবে দিল-রী
সুলতানের অধিকারে আসে। নাসিরউদ্দীন মাহমুদ বঙ্গদের শাসনকর্তা নিযুক্ত হলেন।
ইওজ খলজি শিল্প ও সাহিত্যের একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায়
গৌড়ের জুমা মসজিদ এবং আরও কয়েকটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। তাঁর আমলে মধ্য
এশিয়া হতে বহু মুসলিম সুফী ও সৈয়দ তাঁর দরবারে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এ
সমস- সুফী ও সুধীগণ বঙ্গদেশে ইসলাম প্রচারে যথেষ্ট সহায়তা করেন। তাঁদের
আগমন ও ইওজ খলজির পৃষ্ঠপোষকতায় লখনৌতি মুসলিম শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে
পরিণত হয়।
ইওজ খলজির মৃত্যুর পর থেকে ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন- ষাট বছর বাংলা দিল-র
মুসলমান শাসকদের একটি প্রদেশেী পরিগণিত হয়। এ সময় পনের জন শাসনকর্তা বাংলা
শাসন করেন। এঁদের দশ জন ছিলেন দাস। দাসদের ‘মামলুক’ বলা হয়। এ কারণে ষাট
বছরের বাংলার শাসনকে অনেকে দাস শাসন বা মামলুক শাসন বলে অভিহিত করে। কিন্তু
এ যুগের পনের জন শাসকের সকলেই তুর্কী বংশের ছিলেন। এ কারণে এ সময়কালকে
তুর্কী যুগ বলা সবচেয়ে যথার্থ হতে পারে। তুর্কী শাসকদের সময়ে দিল-তে
অভ্যন-রীণ গোলযোগ চলছিল। সুতরাং, বাংলার মতো দূরবর্তী প্রদেশেরী দিকে
সুলতানদের মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ ছিলনা। পরিণামে বাংলার তুর্কী শাসকরা অনেকটা
স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করতেন। প্রথম তুর্কী শাসনকর্তা ছিলেন
নাসিরউদ্দীন মাহমুদ। তিনি ছিলেন দিল-র সুলতান ইলতুৎমিশেরী পুত্র। ১২২৯
খ্রিস্টাব্দে নাসিরউদ্দীন মাহমুদ মৃত্যুবরণ করলে অল্প সময়ের জন্য বাংলায়
ক্ষমতায় আসেন দওলত শাহ- বিন-মওদুদ। ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে সুলতান ইলতুৎমিশের
মৃত্যু হলে দিল-তে গোলযোগ দেখা যায়। এ সুযোগে আওর খানী আইবক লখনৌতির ক্ষমতা
দখল করে নেন। কিন্তু অল্পকাল পরেই বিহারের শাসনকর্তা তুঘরল তুঘান খানের
হাতে তাঁর পরাজয় ঘটে। তুঘান খান ১২৪৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন- ৯ বছর বাংলার
শাসনকর্তা ছিলেন। এরপর মাত্র ২ বছর লখনৌতির ক্ষমতায় ছিলেন ওমর খান।
১২৪৭ থেকে ১২৫১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন- বাংলা শাসন করেন জালালউদ্দিন মাসুদ
জানি। তিনি লখনৌতিতে শানি- ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। পরবর্তী শাসক ছিলেন
অযোধ্যার শাসনকর্তা মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন ইউজবক। সীমান- অঞ্চলে তিনি
রাজ্যসীমার বিস-ার ঘটান। যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করার পর মাসুদ জানি ১২৫৫
খিস্টাব্দে ‘মুঘিসউদ্দিন’ উপাধি ধারণ করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি ১২৫৭
খ্রিস্টাব্দে নিহত হন। পরবর্তী দুই বছর লখনৌতি স্বাধীনভাবে শাসন করেন মালিক
উজ্জউদ্দিন ইউজবক। পরে ১২৬৯ খ্রিস্টাব্দে কারা প্রদেশের শাসনকর্তা
তাজউদ্দিন আরসালান খান লখনৌতির সিংহাসনে বসেন। আরসালান খানের পর বাংলার
শাসনকর্তা হন তাতার খান। তিনি দিল-র প্রতি আনুগত্যী প্রকাশ করলেও কয়েক
বছরের মধ্যে দিল-র সাথে বাংলার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। তাতার খানের পর
অল্পদিনের জন্যী বাংলার ক্ষমতার বসেছিলেন শের খান।
পরবর্তী শাসনকর্তা তুঘরিল ছিলেন মামলুক তুর্কীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। উত্তর
এবং পশ্চিম বাংলা ছাড়াও ঢাকা এবং ফরিদপুরের বেশ কিছু অঞ্চল তিনি অধিকারে
আনেন। সোনারগাঁওয়ের নিকট তিনি নারকিল- নামে এক দুর্গ তৈরিা করেছিলেন।
সাধারণ মানুষের কাছে দুর্গটি তুঘরিলের কিল- নামে পরিচিত ছিল। তুঘরিল
‘মুঘিসউদ্দিন’ উপাধি নিয়ো স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ফলে দিল-র সুলতান বলবন
প্রচণ্ড আক্রমণ হানেন তুঘরিলের উপর। ১২৮১ খ্রিস্টাব্দেী বলবনের হাতে পরাজিত
ও নিহত হন তুঘরিল। বাংলার শাসনকর্তারা বিদ্রোহ করে বলে এবার বলবন তাঁর
ছেলে বুঘরা খানকে বাংলার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ করেন। পরবর্তী ছয় বছর বাংলা
দিল-র অধীনে ছিল। ১২৮৭ খ্রিস্টাব্দেী বলবনের মৃত্যুর পর বুঘরা খান
‘নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহ’ নাম নিয়ে স্বাধীন সুলতান হিসাবে বাংলা শাসন করতে
থাকেন। এ সময় দিল-র সুলতান ছিলেন বুঘরা খানের ছেলে কায়কোবাদ।
কায়কোবাদের মৃত্যু সংবাদে বুঘরা খানের মন ভেঙ্গে যায়। তিনি তাঁর অন্য পুত্র
রুকনউদ্দিন কায়কাউসকে বাংলার সিংহাসনে বসিয়ে নিজে সরে যান। কায়কাউস
(১২৯১-১৩০০ খ্রিঃ) দশ বছর বাংলার শাসক ছিলেন। তাঁর কোনো ছেলে না থাকায়
পরবর্তী শাসনকর্তা হন মালিক ফিরুজ ইতগীন। তিনি সুলতান হিসেবে নতুন নাম ধারণ
করেন ‘সুলতান শামসুদ্দিন ফিরুজ শাহ’। ফিরুজ শাহের মৃত্যু হলে পুত্র
গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। অল্পকাল পরেই দিল-র সুলতান
গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের হাতে তিনি পরাজিত ও বন্দী হন। পরে ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে
বাহাদুর শাহকে মুক্তি দিয়ে সোনারগাঁওয়ে পাঠান হয়। সেখানে তিনি বাহরাম খানের
সাথে যুগ্মভাবে শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। লখনৌতির গভর্নর হন নাসিরউদ্দিন
ইব্রাহিম ও কদর খান। ইজ্জউদ্দিনকে নিয়োগ করা হয় সাতগাঁওয়ের গভর্নরের পদে।
১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর বিদ্রোহ করলে তিনি বাহরাম খানের
হাতে নিহত হন। এরপর থেকে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন- বাংলা দিল-র অধীনে ছিল।
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস: দ্বিতীয় অংশ
বাংলায় স্বাধীন সুলতানী শাসনের ইতিহাস
দিল্লির সুলতানগণ ১৩৩৮ থেকে ১৫৩৮ খিস্টাব্দ পর্যন- দুইশত বছর বাংলাকে
তাঁদের অধিকারে রাখতে পারেননি। প্রথমদিকে দিল্লির সুলতানের সৈন্যবাহিনী
আক্রমণ চালিয়েছে। চেষ্টা করেছে বাংলাকে নিজের অধিকারে আনার জন্য। অবশেষে
সফল হতে না পেরে হাল ছেড়ে দিয়েছে। এ সময়ে বাইরের অন্য কোনো আক্রমণেরও তেমন
সম্ভাবনা ছিলনা। তাই বাংলার সুলতানগণ স্বাধীনভাবে এবং নিশ্চিনে- এদেশ শাসন
করতে পেরেছেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের মাধ্যমে স্বাধীনতার সূচনা হলেও
ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতানদের হাতে বাংলা প্রথম সি'তিশীলতা লাভ করে।
স্বাধীন সুলতানী আমল (১৩৩৮ খ্রিঃ - ১৫৩৮ খ্রিঃ)
১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁওয়ের শাসনকর্তা বাহরাম খানের মৃত্যু হয়। বাহরাম
খানের বর্মরক্ষক ছিলেন ‘ফখরা’ নামের একজন রাজকর্মচারী। প্রভুর মৃত্যুর পর
তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ‘ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ’ নাম নিয়ে
সোনারগাঁওয়ের সিংহাসনে বসেন। এভাবেই সূচনা হয় বাংলার স্বাধীন সুলতানি
যুগের। দিল্লির মুহম্মদ-বিন-তুঘলকেরী এ সময় সুদূর বাঙলার দিকে দৃষ্টি
দেওয়ার সুযোগ ছিলনা। তাই সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনতার সূচনা হলেও ধীরে ধীরে
স্বাধীন অঞ্চলের সীমা বিসতৃত হতে থাকে। পরবর্তী দুইশত বছর এ স্বাধীনতা কেউ
কেড়ে নিতে পারেনি।
সোনারগাঁওয়ের বাইরে লখনৌতির শাসনকেন্দ্রে তখন দিল্লির শাসনকর্তাগণ শাসন
করতেন। তাঁরা ফখরুদ্দিনেরী স্বাধীনতা ঘোষণাকে সুনজরে দেখেননি। তাই লখনৌতির
শাসনকর্তা কদর খান ও সাতগাঁওয়ের শাসনকর্তা ইজ্জউদ্দীন মিলিতভাবে সোনারগাঁও
আক্রমণ করেন। কিন্তু তাঁরা সফল হতে পারেননি। কদর খান ফখরুদ্দিনের সৈন্যদের
হাতে পরাজিত ও নিহত হন।
একজন স্বাধীন সুলতান হিসাবে ফখরুদ্দিন নিজ নামে মুদ্রা জারি করেছিলেন। তাঁর
মুদ্রায় খোদিত তারিখ দেখে ধারণা করা যায়, তিনি ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৪৯
খ্রিস্টাব্দ পর্যন- সোনারগাঁও রাজত্ব করেন। ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ তাঁর
রাজসীমা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কিছুটা বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম
চট্টগ্রাম জয় করেন। চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন- একটি রাজপথ ফখরুদ্দিন
মুবারক শাহ তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়। ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও
টাকশাল থেকে ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহ নামাঙ্কিত মুদ্রা জারি করা হয়। গাজী
শাহের নামাঙ্কিত মুদ্রায় ১৩৫২ খিস্টাব্দ পর্যন- তারিখ পাওয়া যায়। সুতরাং
বোঝা যায়, ফখরুদ্দিন পুত্র গাজী শাহ পিতার মৃত্যুর পর সোনারগাঁওয়ের স্বাধীন
সুলতান হিসাবে সিংহাসনে বসেন এবং ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন- তিন বছর রাজত্ব
করেন।
ইলিয়াস শাহী বংশ
সোনারগাঁওয়ে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ যখন স্বাধীন সুলতান তখন লখনৌতির সিংহাসন
দখন করেছিলেন সেখানকার সেনাপতি আলী মুবারক। সিংহাসনে বসে তিনি ‘আলাউদ্দিন
আলী শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। লখনৌতিতে তিনিও স্বাধীন রাজ্য গড়ে তোলেন। পরে
রাজধানী স্থানান-রিত করেন পান্ডুয়ায় (ফিরোজাবাদ)। আলী শাহ ক্ষমতায় ছিলেন
১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন-। তাঁর দুধভাই ছিলেন হাজী ইলিয়াস। তিনি আলী শাহকে
পরাজিত ও নিহত করে ‘শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ’ নাম নিয়ে বাংলায় একটি রাজবংশ
প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাজবংশের নাম ইলিয়াস শাহী বংশ। এরপর ইলিয়াস শাহের
বংশধরগণ অনেক দিন বাংলা শাসন করেন। মাঝখানে কিছুদিনের জন্য হিন্দু রাজত্বের
উত্থান ঘটেছিল।
১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে ফিরোজাবাদের সিংহাসন অধিকারের মাধ্যমে ইলিয়াস শাহ উত্তর ও
উত্তর-পশ্চিম বাংলার অধিপতি হন। সোনারগাঁও ও সাতগাঁও তখনও তাঁর শাসনের
বাইরে ছিল। ইলিয়াস শাহের স্বপ্ন ছিল সমগ্র বাংলার অধিপতি হওয়া। তিনি প্রথম
দৃষ্টি দেন পশ্চিম বাংলার দিকে। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে সাতগাঁও তাঁর
অধিকারে আসে। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে নেপাল আক্রমণ করে বহু ধনরত্ন হস্তগত করা
হয়। এ সময় তিনি ত্রিহুত বা উত্তর বিহারের কিছু অংশ জয় করে বহু ধনরত্ন
হস্তগত করেন। উড়িষ্যাও তাঁর অধিকারে আসে। তবে ইলিয়াস শাহের গুরুত্বপূর্ণ
সাফল্য ছিল পূর্ব বাংলা অধিকার।
ইখতিয়ার উদ্দিন গাজী শাহ ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁও-এ ইলিয়াস শাহের হাতে
পরাজিত হন। সোনারগাঁও দখলের মাধ্যমে সমগ্র বাংলার অধিকার সম্পন্ন হয়। তাই
বলা হয়, ১৩৩৮ খিস্টাব্দে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ বাংলার স্বাধীনতার সূচনা
করলেও প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে।
বাংলার বাইরেও বিহারের কিছু অংশ- চম্পারণ, গোরক্ষপুর এবং কাশী ইলিয়াস শাহ
জয় করেছিলেন। কামরূপের কিছু অংশও তিনি জয় করেন। মোটকথা, তাঁর রাজসীমা আসাম
হতে বারানসি পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। ইলিয়াস শাহ দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক
ছিন্ন করে নিজ নামে খুৎবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করায় সুলতান ফিরুজ শাহ তুঘলক
অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।
প্রথম দিকে দিল্লির সুলতান বাংলার এ স্বাধীনতা মেনে নেননি। সুলতান ফিরুজ
শাহ তুঘলক ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইলিয়াস শাহের
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাঁর চেষ্টা ছিল বাংলাকে দিল্লির অধিকারে নিয়ে আসা।
কিন' তিনি সফল হননি। ইলিয়াস শাহ দুর্ভেদ্য একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
এদিকে বর্ষা এলে জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ফিরোজ শাহ সন্ধির মাধ্যমে
বাংলার স্বাধীনতাকে মেনে নিয়ে ইলিয়াস শাহের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে
দিল্লি ফিরে যান।
শাসক হিসেবে ইলিয়াস শাহ ছিলেন বিচক্ষণ ও জনপ্রিয়। তাঁর শাসনামলে রাজ্যে
শান্তি ও শৃঙ্খলা বিরাজিত ছিল। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক
গড়ে উঠেছিল। হাজিপুর নামক একটি শহর তিনি নির্মাণ করেছিলেন। ফিরুজাবাদের
বিরাট হাম্বামখানা তিনিই নির্মাণ করেন। এ আমলে স্থাপত্য শিল্প ও সংস্কৃতি
যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। তিনি একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। তিনি
ফকির-দরবেশদের খুব শ্রদ্ধা করতেন।
ইলিয়াস শাহ লখনৌতির শাসক হিসেবে বঙ্গ অধিকার করলেও তিনি দুই ভূখণ্ডকে
একত্রিত করে বৃহত্তর বাংলার সৃষ্টি করেছিলেন। এ সময় হতেই বাংলার সকল
অঞ্চলের অধিবাসী ‘বাঙালি’ বলে পরিচিত হয়। ইলিয়াস শাহ ‘শাহ-ই বাঙ্গালা’ ও
‘শাহ-ই-বাঙালি’ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-১৩৯৩
খ্রিঃ) বাংলার সিংহাসনে বসেন। পিতার মতো তিনিও দক্ষ এবং শক্তিশালী শাসক
ছিলেন। দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৫৮ থেকে ১৩৬০ খ্রিস্টাব্দী
পর্যন্ত পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু এবারও ফিরোজ শাহ তুঘলককে ব্যর্থ
হতে হয়। পিতার মতো সিকান্দার শাহও একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। উভয়
পক্ষের মধ্যে সন্ধির মাধ্যমে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী
জাফর খানকে সোনারগাঁওয়ের শাসন ক্ষমতা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু জাফর
খান এ পদ গ্রহণে রাজি হলেন না। ফিরোজ শাহ তুঘলকের সঙ্গে তিনিও দিল্লিতে
ফিরে গেলেন। সোনারগাঁও এবং লখনৌতিতে আবার আগের মতোই সিকান্দার শাহের
কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ন রইল। ইলিয়াস শাহ যে স্বাধীন সুলতানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন
সিকান্দার শাহ সেভাবেই একে আরও শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করতে সক্ষম হন।
সুলতান সিকান্দার শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দিন ‘আজম শাহ’
(১৩৯৩-১৪১১ খ্রি:) উপাধি গ্রহণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন। ইলিয়াস শাহ ও
সিকান্দার শাহ যুদ্ধ বিগ্রহ ও স্বাধীনতা রক্ষায় নিজেদের দক্ষতার পরিচয়
দিয়েছেন। কিন্তু গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের কৃতিত্ব ছিল অন্যত্র। তিনি তাঁর
প্রজারঞ্জক ব্যক্তিত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালে
আসামে বিফল অভিযান প্রেরণ করেন। জৌনপুরের রাজা খান জাহানের সহিত তিনি
বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। চীনা সম্রাট ইয়াংলো তাঁর দরবারে প্রতিনিধি দল প্রেরণ
করেন। তিনিও শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে চীনা সম্রাটের নিকট মূল্যবান উপঢৌকন
প্রেরণ করেন। মোটকথা, আযম শাহ কোন যুদ্ধে না জড়ালেও পিতা এবং পিতামহের গড়া
বিশাল রাজত্বকে অটুট রাখতে পেরেছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ একজন
ন্যায়বিচারক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতীন গ্রনে' তাঁর ন্যায় বিচারের এক অতি
উজ্জ্বল কাহিনী বর্ণিত আছে।
সুপণ্ডিত হিসেবে সুলতান গিয়াসউদ্দীন আযম শাহের যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল।
কবি-সাহিত্যিকগণকে তিনি সমাদর ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি কাব্য রসিক ছিলেন এবং
নিজেও ফার্সী ভাষায় কবিতা রচনা করতেন। পারস্যের প্রখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে
তাঁর পত্রালাপ হতো।
মুসলমান শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য
গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ বঙ্গের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে রয়েছেন।
তাঁর রাজত্বাকালেই প্রথম বাঙালি মুসলমান কবি শাহ্ মুহম্মদ সগীর
‘ইউছুফ-জুলেখা’ কাব্য রচনা করেন। আযম শাহের রাজত্বকালেই বিখ্যাত সুফী সাধক
নূর কুতুব-উল-আলম পান্ডুয়ায় আস্তানা গাড়েন। এ স্থান হতেই তিনি বাংলার
বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম ধর্মের প্রচার করে বেড়াতেন। ফলে পান্ডুয়া ইসলাম
শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে ভারতবর্ষে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল।
ধর্মনিষ্ঠ সুলতানের নিকট হতে তিনি সর্বপ্রকার সাহায্য লাভ করেছিলেন। সুলতান
মক্কা ও মদিনাতেও মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের জন্য অর্থ ব্যয় করতেন। কোনো
কোনো ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ব্যর্থতা সত্ত্বেও গিয়াসউদ্দীন আযম শাহ
ছিলেন বঙ্গের শ্রেষ্ঠ সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহী বংশের শেষ সুলতান।
তাঁর মৃত্যুর পর হতেই এ বংশের পতন শুরু হয়।
রাজা গণেশ ও হাবসী শাসন
সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, বাংলার ইতিহাসের দুইশত বছর (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রিঃ)
মুসলমান সুলতানদের স্বাধীন রাজত্বের যুগ। তথাপি এ দুইশত বছরের মাঝামাঝি
অল্প সময়ের জন্য কিছুটা বিরতি ছিল। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের মৃত্যুর পর তাঁর
পুত্র সাইফুদ্দিন হামজা শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু এ সময় অভিজাতদের মধ্যে
ক্ষমতা দখল নিয়ে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। তিনি এক বছর শাসন করার পর ১৪১২
খ্রিস্টাব্দে তাঁর ক্রীতদাস শিহাবউদ্দিনের হাতে নিহত হন। শিহাবউদ্দিন
সুলতান হয়ে নিজের নাম নেন ‘শিহাবউদ্দিন বায়াজিদ শাহ’। কিন' দুই বছরের মাথায়
১৪১৪-১৫ খ্রিস্টাব্দে তিনিও ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন। এ সুযোগে
হিন্দু অভিজাত রাজা গণেশ বাংলার ক্ষমতা দখল করেন।
বাংলার সুলতানরা অনেক উচ্চপদেই হিন্দুদের নিয়োগ করতেন। আজম শাহের একজন
উচ্চপদস' অমাত্য ছিলেন রাজা গণেশ। জানা যায়, গণেশ প্রথমে দিনাজপুরের
ভাতুলিয়া অঞ্চলের একজন রাজা ছিলেন। তিনি সুলতানের দরবারে চাকরি নেন। চাকরি
নিয়েই তিনি গোপনে শক্তি সঞ্চয় করতে থাকেন। তাঁর ইচ্ছে ছিল মুসলমানদের হটিয়ে
পুনরায় হিন্দু শক্তির ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যেই তিনি ইলিয়াস শাহীর
বংশ উচ্ছেদ করে নিজে ক্ষমতায় বসেন। গণেশ অনেক সুফী সাধককে হত্যা করেন।
মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য দরবেশদের নেতা নূর কুতুব-উল-আলম জৌনপুরের
সুলতান ইব্রাহিম শর্কির নিকট আবেদন জানান। ইব্রাহিম শর্কি সসৈন্যে বাংলায়
উপসি'ত হলে গণেশ ভয় পেয়ে যান। অবশেষে তিনি আপোস করেন দরবেশ নূর
কুতুব-উল-আলমের সাথে। শর্ত অনুযায়ী গণেশ তাঁর ছেলে যদুকে ইসলাম ধর্মে
দীক্ষিত করেন এবং ছেলের হাতে বাংলার সিংহাসন ছেড়ে দেন। মুসলমান হওয়ার পর
যদুর নাম হয় জালালউদ্দিন মাহমুদ। সুলতান ইব্রাহিম শর্কি জামালউদ্দিনকে
সিংহাসনে বসিয়ে ফিরে যান নিজ দেশ জৌনপুরে।
গণেশ দু’বার সিংহাসনে বসেছিলেন। প্রথমবার কয়েক মাস মাত্র ক্ষমতায় ছিলেন।
১৪১৫ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি ইব্রাহিম শর্কি জালালউদ্দিন মাহমুদ শাহকে
সিংহাসনে বসান। ইব্রাহিম শর্কি ফিরে গেলে নিজেকে নিরাপদ মনে করেন গণেশ। তখন
জালালউদ্দিনকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দিয়ে পুনরায় নিজে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
অনেক আচার-অনুষ্ঠান করিয়ে ছেলেকে আবার হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনেন। গণেশ ১৪১৮
খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। রাজা গণেশের মৃত্যুর পর হিন্দু আমাত্যগণ
গণেশের পুত্র মহেন্দ্রদেবকে বঙ্গে সিংহাসনে বসান। কিন' অতি অল্পকালের
মধ্যেই মহেন্দ্রদেবকে অপসারিত করে জালালউদ্দিন দ্বিতীয়বার বঙ্গের সিংহাসনে
আরোহণ করেন। এ পর্যায়ে তিনি একটানা ১৪৩১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায়
ছিলেন। এ সুযোগ্য শাসকের সময় বাংলার রাজ্যসীমা অনেক বৃদ্ধি পায়। প্রায়
সমগ্র বাংলা এবং আরাকান ব্যতীত ত্রিপুরা ও দক্ষিণ বিহারেরও কিছু অংশ অন্তত
সাময়িকভাবে তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজ্যের বিভিন্ন টাকশাল হতে তাঁর
নামে মুদ্রা প্রকাশিত হয়েছিল। পান্ডুয়া হতে তিনি গৌড়ে তাঁর রাজধানী স্থাপন
করেছিলেন।
জালালউদ্দিন মাহমুদ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র শামসুদ্দিন আহমদ
শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দে আহমদ শাহ আমাত্যবর্গের
ষড়যন্ত্রে সাদি খান ও নাসির খান নামক ক্রীতদাসের হাতে নিহত হন। এভাবে রাজা
গণেশ ও তাঁর বংশধরদের প্রায় ত্রিশ বছরের রাজত্বের অবসান ঘটে।
পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশের শাসন
শামসুদ্দিন আহমদ শাহের মৃত্যুর পর তার হত্যাকারী ক্রীতদাস নাসির খান বাংলার
সিংহাসনে বসেন। কিন' আহমদ শাহকে হত্যা করার ব্যাপারে যে সকল অভিজাতবর্গ
নাসির খানকে ইন্ধন দেন তারা নাসির খানের সিংহাসনে আরোহণকে খুশি মনে গ্রহণ
করতে পারলেন না। সম্ভবত ক্রীতদাসের আধিপত্যকে তারা অপমানজনক মনে করেছিলেন।
তাই তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নাসির খানকে হত্যা করেন।
নাসির খান নিহত হওয়ার পর গৌড়ের সিংহাসন কিছু সময়ের জন্য শূন্য অবস্থায় পড়ে
রইল। আহমদ শাহের কোনো পুত্র সন্তান ছিলনা। অতপর অভিজাতবর্গ মাহমুদ নামে
ইলিয়াস শাহের এক বংশধরকে ১৪৫২ খিস্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসনে বসান। ইতিহাসে
তিনি নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ নামে পরিচিত। ইলিয়াস শাহের বংশধরগণ এভাবে
পুনরায় স্বাধীন রাজত্ব শুরু করেন। তাই এ যুগকে বলা হয় ‘পরবর্তী ইলিয়াস শাহী
যুগ’। নাসিরউদ্দিন একজন দক্ষ সেনাপতি ও ন্যায়পরায়ন শাসক ছিলেন। যশোর ও
খুলনা অঞ্চল নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের রাজত্বকালে মুসলমান সাম্রাজ্যভুক্ত
হয়েছিল। পশ্চিম বঙ্গ, পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ ও বিহারের কতকাংশ তাঁর
সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তিনি নিজ নামে মুদ্রাও জারি করেছিলেন।
১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র
রুকনউদ্দিন বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। পিতার রাজত্বকাল থেকেই বরবক
শাহ শাসক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন সাতগাঁওয়ের
শাসনকর্তা। তাঁর রাজত্বকালে বাংলার রাজ্যসীমা অনেক বৃদ্ধি পায়। বরবক শাহের
সহিত কামরূপ রাজ্যের সংর্ঘষের কথা জানা যায়। কিন্তু ফলাফল কি হয়েছিল তা
সঠিক বলা যায় না। গঙ্গা নদীর উত্তরাংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। ভাগলপুর
তাঁর শাসনকালে মুসলমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। কিন্তু মুঙ্গেরের পশ্চিমে
অবসি'ত জেলাগুলো জৌনপুরের শাসনকর্তা মাহমুদ শার্কীর অধীনে ছিল। তাঁর সময়ে এ
অঞ্চল জয় করা হয় বলে মনে হয়। চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব নিয়ে গোলযোগ ছিল। বরবক
শাহের রাজত্বকালের প্রথম দিকে ইহা আরাকান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। কিন' শেষ
দিকে বরবক শাহ ইহা পুনরুদ্ধার করেন। যশোহর ও খুলনা তাঁর অধিকারে ছিল। তিনি
দক্ষিণ দিকেও তাঁর রাজ্য বিস-ৃত করেছিলেন।
বরবক শাহই প্রথম অসংখ্য আবিসিনীয় ক্রীতদাস (হাবসী ক্রীতদাস) সংগ্রহ করে
সেনাবাহিনী ও রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। নিয়োগকৃত এ
হাবসী ক্রীতাদাসের সংখ্যা ছিল আট হাজার। তিনি সম্ভবত রাজ্যে একটি নিজস্ব
দল গঠনের উদ্দেশ্যে এ সকল হাবসীদের নিয়ে বাহিনী গঠন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এ
ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যের জন্য বিপদ ডেকে নিয়ে আসে।
সুলতান রুকনউদ্দীন বরবক শাহ একজন মহাপন্ডিত ছিলেন। তাঁর বিভিন্ন শিলালিপিতে
নিজ নামে এবং বিভিন্ন রাজকীয় খউপাধির সঙ্গে ‘আল-ফাজিল’ ও ‘আল-কামিল’⎯ এ
দুটি উপাধির উলে- দেখতে পাওয়া যায়। এ হতে প্রমাণিত হয় যে, বরবক শাহ শিক্ষা
ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উপাধি লাভ করেছিলেন। তিনি শুধু পণ্ডিতই ছিলেন না, তিনি
বিদ্যা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মেরই
বিদ্বান ও পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। বৃহস্পতি মিশ্র
ছিলেন গীতগোবিন্দটীকা, কুমারসম্ভবটীকা, রঘুবংশটীকা প্রভৃতি গ্রনে'র লেখক।
‘শ্রীকৃষ্ণ বিজয়’ নামক বিখ্যাত বাংলা কাব্যের রচয়িতা মালাধর বসু এ সময়ের
একজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত ছিলেন। বাংলা রামায়ণের রচয়িতা কৃত্তিবাস বরবক শাহের
অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। বাসুদেবও সম্ভবত বরবক শাহের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। এ
সময়ের মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে ইব্রাহিম কাইয়ুম ফারুকী, আমীর
জয়েনউদ্দীন হারাভী, আমীর শিহাবউদ্দীন কিরমানী ও মনসুর শিরাজীর নাম
বিশেষভাবে উলে- যোগ্য। বরবক শাহ বিভিন্নভাবে কবি ও সাহিত্যিকদের সাহায্যখ
করেছিলেন। তিনি যে একজন উদার ও অসামপ্রদায়িক মনের নরপতি ছিলেন তা হিন্দু
কবি-পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বহু হিন্দুকে উচ্চ রাজপদে নিয়োগ হতে বুঝা যায়।
এ দিক দিয়ে বরবক শাহের ন্যায় উদার মনোভাবাপন্ন শাসক শুধু বাংলার ইতিহাসে
নহে, ভারতবর্ষের ইতিহাসেও দুর্লভ।
বরবক শাহ একজন প্রকৃত সৌন্দর্যরসিক ছিলেন। গৌড়ের ‘দাখিল দরওয়াজা’ নামে
পরিচিত বিরাট ও সুন্দর তোরণটি বরবক শাহ্ই নির্মাণ করেছিলেন। এ আমলে
চট্টগ্রামে এবং পটুয়াখালী জেলার মীর্জাগঞ্জে দুটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। এ
সমস্ত কার্যাবলী বিবেচনা করলে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে বরবক শাহ্কে অন্যতম
শ্রেষ্ঠ বলা যায়।
১৪৭৪ খ্রিস্টাব্দে বরবক শাহ পরলোক গমন করেন। পরে তাঁর পুত্র সামসুদ্দিন আবু
মুজাফফর ইউসুফ শাহ (১৪৭৪- ১৪৮১ খ্রিঃ) বাংলার সুলতান হন। পিতা ও পিতামহের
গড়া বিশাল সাম্রাজ্য তাঁর সময় অক্ষুণ্ন ছিল। তাঁর রাজ্য পশ্চিমে উড়িষ্যা
এবং পূর্বে সিলেট পর্যন্ত বিস-ৃত ছিল।
ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন' তিনি
অসুস' হয়ে পড়লে তাঁকে অপসারণ করা হয়। বরবক শাহের ছোট ভাই হুসাইন
‘জালালউদ্দীন ফতেহ শাহ’ উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন (১৪৮১-১৪৮৭
খ্রিঃ)। তিনি নিজ নামে মুদ্রা জারি করেন। কিন্তু এ সময় রাজদরবারে দুর্যোগ
দেখা দেয়। হাবসী ক্রীতদাসরা এ সময় খুব ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে। এদের প্রতাপ
কমানোর জন্য জালালউদ্দীন ফতেহ শাহ চেষ্টা করেন। এতে সমস্ত হাবসী ক্রীতদাস
একজোট হয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। সুলতান শাহজাদা ছিলেন
প্রাসাদ রক্ষীদলের প্রধান। ক্রীতদাসগণ প্রলোভন দ্বারা সুলতান শাহজাদা ও তার
অধীনস' পাইকদের নিজ দলভুক্ত করে। শাহজাদা রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ফতেহ
শাহ্কে হত্যা করে। ফতেহ শাহ নিহত হলে বাংলার সিংহাসনে ইলিয়াস শাহী বংশের
শাসনকালের পরিসমাপ্তি ঘটে। বাংলায় হাবশিদের রাজত্বের সূচনা হয়।
হাবসী শাসন
বাংলার হাবসী শাসন মাত্র ছয় বছর (১৪৮৭-১৪৯৩ খ্রিঃ) স্থায়ী ছিল। এ সময়
এদেশের ইতিহাস ছিল অন্যায়, অবিচার, বিদ্রোহ, ষড়যন্ত্র আর হতাশায় পরিপূর্ণ। এ
সময়ে চারজন হাবসী সুলতানের মধ্যে তিনজন হাবসী সুলতানকেই হত্যা করা হয়।
হাবসী নেতা সুলতান শাহজাদা ‘বরবক শাহ’ উপাধি নিয়ে প্রথম বাংলার ক্ষমতায়
বসেন। কিন' কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি হাবসী সেনাপতি মালিক আন্দিলের হাতে নিহত
হন। মালিক আন্দিল ‘সাইফুদ্দিন ফিরুজ শাহ’ উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন।
একমাত্র তাঁর তিন বছরের রাজত্বকালের (১৪৮৭-১৪৯০ খ্রিঃ) ইতিহাসই কিছুটা
গৌরবময় ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন দ্বিতীয় নাসিরউদ্দিন শাহমুদ শাহ।
কিন্তু কিছুকাল (১৪৯০-১৪৯১ খ্রিঃ) রাজত্ব করার পরই তিনি নিহত হন। এক হাবসী
সর্দার তাঁকে হত্যা করে ‘শামসুদ্দিন মুজাফফর শাহ’ নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন
(১৪৯১-১৪৯৩ খ্রি:)। অত্যাচারী ও হত্যাকারী হিসেবে তার কুখ্যাতি ছিল। ফলে
গৌড়ের সম্ভ্রান্ত লোকেরা মুজাফফর শাহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহীদের
সাথে যোগ দেন মুজাফফর শাহের উজির সৈয়দ হোসেন। অবশেষে মুজাফফর শাহ নিহত হন।
তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলায় হাবশি শাসনের অবসান ঘটে।
হোসেন শাহী বংশ
হাবসী শাসন উচ্ছেদ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন সৈয়দ হোসেন। সুলতান হয়ে তিনি
‘আলাউদ্দিন হুসেন শাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন। এভাবেই বাংলায় ‘হুসেন শাহী বংশ’
নামে এক নতুন বংশের শাসনপর্ব শুরু হয়। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে
হুসেনশাহী আমল (১৪৯৩-১৫৩৮ খ্রি:) ছিল সবচেয়ে গৌরবময় যুগ।
সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ ছিলেন হুসেন শাহী যুগের শ্রেষ্ঠ সুলতান। তিনি
আরব দেশীয় সৈয়দ বংশের লোক ছিলেন। পিতা সৈয়দ আশরাফ-আল-হুসাইনী ও ভাই ইউসুফের
সাথে তিনি মক্কা হতে বাংলায় আসেন এবং রাঢ়ের চাঁদপাড়া গ্রামে প্রথমে বসবাস
শুরু করেন। হুসেন শাহ পরে রাজধানী গৌড়ে যান এবং মুজাফফর শাহের অধীনে চাকরি
লাভ করেন। পরে তিনি উজির হন। এভাবেই তিনি বাংলার ক্ষমতায় আসেন।
আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সিংহাসনে আরোহণের পূর্ব হতে সাম্রাজ্যে অরাজকতা ও
বিশৃঙ্খলা বিরাজিত ছিল। রাজ্যের দায়িত্বভার গ্রহণের পর তিনি দেশে শান্তি ও
শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। হাবসী গোষ্ঠীর দুঃশাসনের ফলে দেশে
অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রতিটি সুলতানের হত্যার পেছনে তারা প্রধান ভূমিকা
পালন করত। সিংহাসন লাভের পর হুসেন শাহ হাবসীদের এরূপ কার্যকলাপ বন্ধ করতে
নির্দেশ দেন। কিন' তারা তাঁর আদেশ অমান্য করলে তিনি তাদের হত্যার আদেশ দেন।
হুসেন শাহের এ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে প্রায় বার হাজার হাবসী প্রাণ
হারায়। বাকি হাবসীরা রাজ্য হতে বিতাড়িত হলো।
আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পরবর্তী পদক্ষেপ ছিল দেহরক্ষী পাইক বাহিনীর ক্ষমতার
বিনাশ। এ পাইক বাহিনী রাজপ্রাসাদের সকল ষড়যন্ত্রের মূলে কাজ করত। হুসেন শাহ
পাইকদের দল ভেঙ্গে দেন। তাদের জায়গায় সম্ভ্রান্ত হিন্দু ও মুসলমানদের নিয়ে
একটি নতুন রক্ষীদল গঠন করেন।
আলাউদ্দিন হুসেন শাহ রাজ্যের কল্যাণের লক্ষে বঙ্গের রাজনীতি ও সমাজ
ব্যবস্থাকে হাবসীদের প্রভাবমুক্ত করতে যেমন সচেষ্ট ছিলেন, তেমিন রাজধানী
পরিবর্তন করে শাসন ব্যবস্থা দৃঢ় করেন। গৌড় রাজ্যের নিকটবর্তী এক জায়গায়
তিনি রাজধানী স্থানান্তর করেছিলেন। বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে একমাত্র তিনিই
পান্ডুয়া বা গৌড় ব্যতীত অন্যত্র রাজধানী স্থাপন করেন। হাবসী শাসনকালে
গোলযোগ
সৃষ্টিকারী আমীর-ওমরাহদের কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। নীচ বংশজাত অত্যাচারী
সকল কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়। তার পরিবর্তে তিনি শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন
গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চ পদে সৈয়দ, মোঙ্গল, আফগান, হিন্দুদেরকে নিযুক্ত করেন। এ
সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা
ফিরে আসে।
আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সময় বাংলার রাজ্যসীমা সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। তিনি
কামরূপ ও কামতা জয় করেন। ঊড়িষ্যা ও ত্রিপুরা রাজ্যের কিছু অংশও তাঁর
করায়ত্ত হয়। উত্তর ও দক্ষিণ বিহারের কিছু অংশও তাঁর অধিকারে আসে।
তিনি আরাকানীদের চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত করেন। এ সময়ে দিল্লির সুলতান
সিকান্দার লোদী বাংলা আক্রমণ করলে তিনি তা প্রতিহত করেন। একমাত্র আসাম
অভিযানে তিনি সফল হতে পারেননি। তাঁর বিশাল রাজ্যে সব রকম নিরাপত্তা বিধানে
হুসেন শাহ সফল হয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘ ছাব্বিশ বছর (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিঃ) রাজত্ব
করেন। এ সুদীর্ঘ সময় সাফল্যের সাথে রাজ্য পরিচালনা করে এ মহান সুলতান ১৫১৯
খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। আলাউদ্দীন হুসেন শাহ্ সুশাসক ও দূরদর্শী
রাজনীতিবিদ ছিলেন। শাসন ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং জনকল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে
তিনি যথেষ্ট উদ্যম, নিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজার জন্য রাজ্য
জয়ই শেষ কথা নয়⎯ যুগোপযোগী ও ন্যায়ভিত্তিক শাসনব্যবস্থাও যে অপরিহার্য, তা
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন। শাসনকার্য পরিচালনায় ও প্রজাপালনের ক্ষেত্রে তিনি
জাতি ও ধর্মের কোনো পার্থক্য সৃষ্টি করেননি। হিন্দু ও মুসলমান-উভয়
সমপ্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সমপ্রীতি স্থাপনের দ্বারা একটি সুষ্ঠু,
সুন্দর ও কল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা তাঁর লক্ষ্য ছিল। এজন্য একজন
গোঁড়া সুন্নী মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিভিন্ন হিন্দুকে যোগ্যতা অনুসারে
শাসনকার্যে নিয়োগ করেছিলেন। হিন্দুদিগকে উৎসাহিত করার জন্য তিনি তাদেরকে
বিভিন্ন উপাধিও প্রদান করতেন। হিন্দুদের প্রতি হুসাইন শাহের এ উদারতা
সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য নির্বাহের চিত্র : শ্রীচৈতন্যক্ষেত্রে বিশেষ ফলপ্রসূ
হয়েছিল এবং বাঙালিদের নিজস্ব ঐতিহ্য সৃষ্টিতে সহায়তা করেছিল। ইহা তাঁর
রাজনৈতিক দূরদর্শিতারও পরিচয় বহন করে। হুসেন শাহের এ ধর্মীয় উদারতা তাঁর
উত্তরাধিকারীদেরও উৎসাহিত করেছিল। তাঁর শান্তিপূর্ণ রাজত্বকালে প্রজারা
সুখে-শান্তিতে বাস করত।
হুসেন শাহের হিন্দু-মুসলামন সমপ্রীতি স্থাপনের প্রচেষ্টা তৎকালীন
সমাজ-জীবনকেও প্রভাবিত করেছিল। তাঁর শাসনকালেই আবির্ভাব ঘটে বৈষ্ণব ধর্মের
প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যের। হুসেন শাহ তাঁর প্রতি উদার মনোভাব পোষণ করতেন এবং
তাঁকে ধর্ম প্রচারে সব রকমের সহায়তা করার জন্য কর্মচারীদের প্রতি নির্দেশ
দেন। সত্যপীরের আরাধনা হুসেন শাহের শাসনকালের আর একটি উলে- যোগ্য ঘটনা।
সত্যপীরের আরাধনা হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেখ একটি
উজ্জ্বল প্রচেষ্টা।
বাংলা সাহিত্যের উন্নতি ও বিকাশ হুসেন শাহের শাসনকালকে ইতিহাসে অমর করে
রেখেছে। তাঁর উদার পৃষ্ঠপোষকতা নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি সাধন
করেছে। হুসেন শাহ যোগ্য কবি ও সাহিত্যিকগণকে উৎসাহিত করার জন্য পুরস্কার
প্রদান করতেন। এ যুগের প্রখ্যাত কবি ও লেখকদের মধ্যে রূপ গোস্বামী, সনাতন
গোস্বামী, মালাধর বসু, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস, পরাগল খান ও যশোরাজ খান উলে-
যোগ্য ছিলেন। হুসেন শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁরা অসংখ্যখ গ্রন' রচনা করেন।
তাঁদের নিরলস সাহিত্য-কীর্তি বাংলার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এ সময়ে মালাধর
বসু ‘শ্রীমদ্ভাগবৎ’ ও ‘পুরাণ’ এবং পরমেশ্বর ‘মহাভারত’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ
করেন। আলাউদ্দীন হুসেন শাহ আরবী ও ফার্সী ভাষারও উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
হুসেন শাহ একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান ছিলেন। নিজ ধর্ম ও সুফী সাধকদের প্রতি
তাঁর অপরিসীম নিষ্ঠা ও ভক্তি ছিল। তাঁর রাজত্বকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে
অসংখ্য মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। এ সমস্ত মসজিদের মধ্যে গৌড়ের ‘ছোট সোনা
মসজিদ’ সবচেয়ে উলে- যোগ্য। রাজ্যে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশের জন্য অনেক
খানকাহ্ ও মাদ্রাসা নির্মিতখ
হয়েছিল। পান্ডুয়ার মুসলমান সাধক কুতুব-উল-আলমের সমাধি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য
হুসেন শাহ প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। হুসেন শাহ্ গৌড়ে একটি দুর্গ ও তোরণ,
মালদহে একটি বিদ্যালয় ও একটি সেতু নির্মাণ করেছিলেন। এ সকল মসজিদ,
মাদ্রাসা, দুর্গ, তোরণ হুসেন শাহের স্থাপত্য প্রীতির পরিচয় বহন করে। তাঁর
২৬ বছরের শাসনকালে বঙ্গে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্পকলার অভাবিত উন্নতি সাধিত
হয়েছিল। এজন্য তাঁর শাসনকালকে বঙ্গের মুসলমান শাসনের ইতিহাসে ‘স্বর্ণযুগ’
বলা হয়।
আলাউদ্দিন হুসেন শাহের মৃত্যুর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র নুসরত শাহ
‘নাসিরউদ্দিন আবুল মুজাফফর নুরসত শাহ’ (১৫১৯- ১৫৩২ খ্রিঃ) উপাধি নিয়ে
বাংলার সিংহাসনে বসেন। তাঁর দক্ষতা দেখে হুসেন শাহ তার রাজত্বকালেই
শাসনকার্যের কিছু কিছু ক্ষমতা নুসরত শাহকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সিংহাসনে বসেও
তিনি পিতার মতো দক্ষতা দেখাতে পেরেছিলেন। এ সময় সমগ্র বিহার তাঁর অধীনে
আসে। তাঁর সময়ে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম মুঘল সম্রাট
বাবর বাংলা অভিযানের জন্য সৈন্য পাঠান। নুসরত শাহ প্রথমে বাবরের সাথে
মিত্রতা স্থাপন করেন। পরে যুদ্ধ শুরু হলে সন্ধি করে বাংলার সিংহাসনকে
নিরাপদ রাখেন। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে নুসরত শাহ আততায়ীর হাতে নিহত হন।
সুলতান নুসরত শাহ্ তাঁর সময়ের একজন উলে- যোগ্য শাসক ছিলেন। জনগণের প্রতি
তিনি ছিলেন সহনশীল এবংখ সহৃদয়। প্রজাদের পানিকষ্ট নিবারণের জন্য তিনি
রাজ্যের বহু স্থানে কূপ ও পুকুর খনন করেছিলেন। বাগেরহাটের ‘মিঠা পুকুর’ আজও
তার কীর্তি ঘোষণা করছে। নুসরত শাহের মানবিক গুণাবলী তাঁকে তাঁর প্রজাদের
নিকট জনপ্রিয় করে তুলেছিল। হিন্দুরাও তাঁর রাজ্যে সুবিচার লাভ করত।
হিন্দু-মুসলমান সমপ্রীতি এ সময়ের বৈশিষ্ট্য ছিল। এ ক্ষেত্রে তিনি তাঁর
পিতার কৃতিত্বকে অম-ন রেখেছিলেন।া
নুসরত শাহের শাসনকালের বহু স্থাপত্য-কীর্তি শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে
তাঁর উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতার পরিচয় বহন করে। গৌড়ের বিখ্যাত ‘কদম রসুল’ ভবনের
প্রকোষ্ঠে তিনি একটি মঞ্চ নির্মাণ করেন। তাঁর উপর হযরত মুহম্মদের (দঃ)
পদচিহ্ন সম্বলিত একটি কালো কারুকার্য খচিত মর্মর বেদি বসানো হয়। গৌড়ের
সুবিখ্যাত ‘বড় সোনা মসজিদ’ বা ‘বারদুয়ারী মসজিদ’ তাঁর আমলের কীর্তি। নুসরত
শাহ্ গৌড়ের অদূরে পিতার সমাধি নির্মাণ করেছিলেন। বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট
নগর এবং রাজশাহী জেলার বাঘা নামক স্থানে তিনি দু’টি মসজিদ নির্মাণ
করেছিলেন। তাঁর মহান কার্যসমূহের আর একটি নিদর্শন হলো সাদুলা-পুরে মহান
আউলিয়া মখদুম আখি সিরাজউদ্দীনের গৌরবময় মাজারের ভিত্তি।
নুসরত শাহের আদেশে কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের কিয়দংশ বাংলায় অনুবাদ
করেছিলেন। তাঁর শাসনকালেই শ্রীকর নন্দী মহাভারতের অশ্বমেধপর্বের বঙ্গানুবাদ
করেন। শ্রীধরও মহাভারতের বঙ্গানুবাদ করেছিলেন। জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারের
জন্য নুসরত শাহ্ দেশের বিভিন্ন স্থানে লাইব্রেরীও স্থাপন করেছিলেন।
বাংলার পরবর্তী সুলতান ছিলেন নুসরত শাহের পুত্র আলাউদ্দিন ফিরুজ শাহ। তিনি
প্রায় এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন। নুসরত শাহের সময় থেকেই অহোম রাজ্যের সাথে
বাংলার সংঘর্ষ চলছিল। ফিরোজ শাহের সময়ও তা অব্যাহত থাকে। নুসরত শাহের
সময়কাল থেকেই শুরু হয় বাংলার স্বাধীন সুলতানী যুগের পতন পর্ব। নুসরত শাহের
উত্তরাধিকারীগণ ছিলেন দুর্বল। তাঁর ছোট ভাই গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ ১৫৩৩
খ্রিস্টাব্দে তাঁর ভাইয়ের ছেলে ফিরোজ শাহকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। কিন'
তাতে অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। বরং নুসরত শাহের শাসনকালে রাজ্যে যে
ভাঙ্গনের সূচনা হয়েছিল, মাহমুদ শাহের শাসনকালে তা সম্পূর্ণ হয়। তাঁর পাঁচ
বছরের রাজত্বকালের উলে- যোগ্য ঘটনা আফগান নেতা শের শাহ শূরের সাথে সংঘর্ষ।
অবশেষে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে শের শাহ গৌড় দখল করলে বাংলার দুইশত বছরের স্বাধীন
সুলতানী যুগের অবসান ঘটে।
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস: শেষ অংশ
আফগান শাসন ও বারভূঁইয়া (১৫৩৮ খ্রি: - ১৫৭৬ খ্রিঃ)
১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলার স্বাধীন সুলতানি যুগের অবসান হলে একে একে বিদেশি
শক্তিসমূহ গ্রাস করতে থাকে বাংলাকে। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন অল্প কিছুকাল
বাংলার রাজধানীর ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। কিন' শেষ পর্যন্ত তাঁকে আফগান
নেতা শের শাহের কাছে পরাজয় মানতে হয়। বাংলা ও বিহার সরাসরি চলে আসে
আফগানদের হাতে। আফগানদের দুই শাখা-শূর আফগান ও কররাণী আফগানরা বেশ কিছুকাল
বাংলা শাসন করে। শেষ পর্যন্ত মুঘল সম্রাট আকবর আফগানদের হাত থেকে বাংলার
ক্ষমতা কেড়ে নেন। রাজধানী দখল করলেও মুঘলরা বাংলার অভ্যন্তরে অনেক দিন
পর্যন্ত প্রকৃত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। এ সময় বাংলায় অনেক বড় বড়
স্বাধীন জমিদার ছিলেন। ‘বার ভূঁইয়া’ নামে পরিচিত এ সমস্ত জমিদার মুঘলদের
অধিকার মেনে নেননি। সম্রাট আকবরের সময় মুঘল সুবাদারগণ ‘বার ভূঁইয়াদের’ দমন
করার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। ‘বার ভূঁইয়াদের’ দমন করা হয় সম্রাট
জাহাঙ্গীরের সময়ে।
আফগান শাসন
মুঘল সম্রাট বাবর ও তাঁর পুত্র হুমায়ুন হুসেনশাহী যুগের শেষদিক থেকেই
চেষ্টা করেছিলেন বাংলাকে মুঘল অধিকারে নিয়ে আসতে। কিন' আফগানদের কারণে
মুঘলদের এ উদ্দেশ্য প্রথম দিকে সফল হয়নি। আফগান নেতা শের খান শূরের সাথে
যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন সম্রাট হুমায়ুন। শের খানের পিতা হাসান খান শূর বিহারে
অবসি'ত সাসারাম অঞ্চলের জায়গিরদার ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি জায়গিরদার
হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। এ সময় বিহারের জায়গিরদার জালাল খান নাবালক বলে তাঁর
অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন শের খান।
সমগ্র ভারতের অধিপতি হওয়ার স্বপ্ন ছিল শের খানের। তাই গোপনে তিনি নিজের
শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকেন। এ লক্ষ্যে অল্প সময়ের মধ্যে শের খান শক্তিশালী
চুনার দুর্গ ও বিহার অধিকার করেন। তিনি ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে দু’বার বাংলার
রাজধানী গৌড় আক্রমণ করেন। এবার সতর্ক হন দিল্লির মুঘল সম্রাট হুমায়ুন। তিনি
শের খানের পিছু ধাওয়া করে বাংলার রাজধানী গৌড় অধিকার করে নেন। গৌড়ের
চমৎকার প্রাসাদ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে হুমায়ুন এর নামকরণ করেন
‘জান্নাতবাদ’। সম্রাট গৌড়ে ৬ মাস আমোদ ফূর্তিতে গা ভাসিয়ে দেন। এ সুযোগে
নিজের শক্তি বাড়াতে থাকেন শের খান। দিল্লি থেকে খবর আসে হুমায়ুনের সৎভাই
হিন্দাল সিংহাসন দখল করার ষড়যন্ত্র করছেন। এ খবর পেয়ে হুমায়ুন দিল্লির দিকে
যাত্রা করেন। এ সুযোগ কাজে লাগান শের খান। তিনি ওঁত পেতে থাকেন বক্সারেরী
নিকট চৌসা নাম স্থানে। গঙ্গা নদীর তীরে এ স্থানে হুমায়ুন পৌঁছালে শের খান
তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অপ্রস'ত হুমায়ুন পরাজিত হন (১৫৩৯ খ্রিঃ)।
মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শের খান ‘শের শাহ’ উপাধি নেন। তিনি
নিজেকে বিহারের স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। এবার বাংলার দিকে দৃষ্টি
দেন তিনি। ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে মুঘল শাসনকর্তা আলী কুলিকে পরাজিত করে তিনি
বাংলা দখল করেন। এ বছরই তিনি হুমায়ুনকে কনৌজের নিকট বিলগ্রামের যুদ্ধে
চূড়ান্তভাবে
পরাজিত করে দিলি- সিংহাসন অধিকার করেন। এভাবে দীর্ঘদিন পর বাংলা আবার
দিল্লির শাসনে চলে আসে। চট্টগ্রামরী ও সিলেট পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশ শের
শাহের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। শের শাহ শূর বংশের বলে এ সময়ের বাংলার শাসন ছিল
শূর আফগান বংশের শাসন।
শের শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জালাল খান ‘ইসলাম খান’ নাম ধারণ করে
দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি আট বছর (১৫৪৫-১৫৫৩ খ্রিঃ) রাজত্ব করেন।
কিন' ইসলাম খানের মৃত্যুর পর তাঁর নাবালক পুত্র ফিরুজ খানের সিংহাসনে
আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে সূর বংশের মধ্যে দলাদলি শুরু হয়। শের খানের ভাগ্নে
মুবারিজ খান ফিরুজ খানকে হত্যা করে ‘মুহম্মদ আদিল’ নাম ধারণ করে দিল্লির
সিংহাসনে বসেন।
ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ঘটনাবলী হতে এ সময় বাংলা বিচ্ছিন্ন ছিল না। তাই ইসলাম
খানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার আফগান শাসক মুহম্মদ খান সূর স্বাধীনতা
ঘোষণা করেন। উপাধি ধারণ করেন ‘মুহম্মদ শাহ শূর’। এ সময় হতে পরবর্তী কুড়ি
বছর পর্যন্ত বাংলা স্বাধীন ছিল। মুহম্মদ শাহ সূর উত্তর ভারতে সাম্রাজ্য
বিস্তারের উদ্দেশ্যে মুহম্মদ আদিল শাহ সূরের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায়
অবতীর্ণ হন। তিনি জৌনপুর জয় করে আগ্রার দিকে অগ্রসর হন। কিন' চূড়ান্ত
পর্যায়ে তিনি পরাজিত ও নিহত হন।
মুহম্মদ শাহ সূর নিহত হলে দিল্লির বাদশাহ আদিল শাহ শাহবাজ খানকে বাংলার
শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। মুহম্মদী শাহের পুত্র খিজির খান তখন এলাহাবাদে
অবস্থান করছিলেন। পিতার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ‘গিয়াসউদ্দীন
বাহাদুর শাহ’ উপাধি গ্রহণ করে নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষণা
করেন। কিছুদিন পর তিনি শাহবাজ খানকে পরাজিত করে বাংলার সিংহাসন অধিকার
করেন।
এ সময় দিল্লির রাজনৈতিক পরিসি'তি যথেষ্ট ঘোলাটে হয়ে উঠে। শের শাহের
বংশধরদের দুর্বলতার সুযোগে মুঘলী বাদশাহ হুয়ায়ূন স্বীয় রাজ্য পুনরুদ্ধার
করেন। কিন' দিল্লিতে তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলায় তিনি মুঘল
আধিপত্যী বিস্তার করার সুযোগ পেলেন না। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র
আকবর দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করে শূর বংশীয়ী আফগান নেতৃবৃন্দকে একে একে দমন
করার জন্য অগ্রসর হলেন। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে (১৫৫৬ খ্রিঃ) আদিল শাহের
সেনাপতি হিমু মুঘল সৈন্যদের নিকট পরাজিত ও নিহত হন। এতে আদিল শাহ অত্যন্ত
দুর্বল হয়ে পড়েন। অতঃপর তিনি বাংলার দিকে পলায়ন করলেন। পথিমধ্যে সুরজগড়ের
নিকটবর্তী ফতেহপুরে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ কর্তৃক এক যুদ্ধে
পরাজিত ও নিহত হন (১৫৫৭ খ্রিঃ)।
বাংলা বিজয়ী আফগান সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহ জৌনপুরের দিকে অগ্রসর
হলে মুঘল সেনাপতি খান-ই-জামান তাঁর গতিরোধ করেন। কূটকুশলী বাহাদুর শাহ
খান-ই-জামানের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর
তিনি বাংলার বাহিরে আর কোনো অভিযান প্রেরণ করেননি। ১৫৬০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর
মৃত্যু হয়।
গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতা জালালউদ্দীন শূর
‘দ্বিতীয় গিয়াসউদ্দীন’ উপাধি গ্রহণ করে বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনিও
তাঁর ভ্রাতার ন্যায় মুঘলদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা করে চলতেন। ১৫৬৩
খ্রিস্টাব্দে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে তাঁর একমাত্র পুত্র বাংলার
সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন' তাঁর নাম জানা যায়নি। মাত্র সাত মাস রাজত্ব করার
পর তৃতীয় গিয়াসউদ্দীন নামে জনৈক আফগান দলনেতা তাঁকে হত্যা করে বাংলার
সিংহাসন অধিকার করেন। কিন' তিনিও বেশি দিন রাজত্ব করতে পারেননি। কররাণী
বংশের রাজা তাজ খান কররাণী গিয়াসউদ্দীনকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসনে নিজেকে
প্রতিষ্ঠিত করেন।
তাজ খান কররাণী ও সুলায়মান খান কররাণী শের শাহের সেনাপতি ছিলেন। কনৌজের
যুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য শের শাহ তাদেরকে দক্ষিণ বিহারে জায়গীর
প্রদান করেন। ইসলাম শাহের রাজত্বকালে তাজ খান কররাণী সেনাপতি ও কূটনৈতিক
পরামর্শদাতা হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ইসলাম শাহের বালকপুত্র ও
উত্তরাধিকারী ফিরুযের সময় তাজ খান উজির নিযুক্ত হন। ফিরুযকে হত্যা করে তাঁর
মাতুল মুহম্মদ আদিল সূর সিংহাসনে বসেন। এ সময় তাজ খান কররাণী পালিয়ে গিয়ে
ভ্রাতাদের সহায়তায় দক্ষিণ বিহারে প্রাধান্য স্থাপন করেন। ১৫৫৭ খ্রিস্টাব্দে
তাজ খান কররাণী নামমাত্র বাংলার সুলতান বাহাদুর শাহ শূরের বশ্যতা স্বীকার
করেন। কিছুদিন পর তিনি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হয়ে পড়েন।
বাংলার সিংহাসনের প্রতিও তার দৃষ্টি ছিল। তিনি সুযোগের অন্বেষণে ছিলেন।
অজ্ঞাতনামা গিয়াসউদ্দীন যখন শূর বংশের সিংহাসন দখল করেন তখন সুযোগ বুঝে তাজ
খান ও তাঁর ভ্রাতারা গিয়াসউদ্দীনকে পরাজিত ও নিহত করে গৌড় দখল করেন। এভাবে
তাজ খান কররাণী বাংলায় কররাণী বংশের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
তাজ খান কররাণীর মৃত্যুর পর ১৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ভাই সুলায়মান খান
কররাণী বাংলার সুলতান হন। এ দক্ষ শাসক আফগান নেতাদের তাঁর দলভুক্ত করেন।
এভাবে বাংলা ও বিহারের অধিকাংশ এলাকা তাঁর অধিভুক্ত হয়। উড়িষ্যাতেও তাঁর
অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সুলায়মান কররাণীর বিজ্ঞ উজির লোদী খানের পরামর্শে
তিনি মুঘল সম্রাট আকবরের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলছিলেন। তিনি সর্বপ্রথম
গৌড় হতে মালদহের ১৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবসি'ত তাণ্ডায় রাজধানী
স্থানান্তর করেন। ১৫৭২ খিস্টাব্দে সুলায়মান কররাণীর মৃত্যু হলে পুত্র
বায়জিদ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু অল্পকাল পরেই এ অত্যাচারী সুলতানকে হত্যা
করেন আফগান সর্দাররা। এবার সিংহাসনে বসেন সুলায়মান কররাণীর দ্বিতীয় পুত্র
দাউদ কররাণী। তিনিই ছিলেন বাংলায় শেষ আফগান শাসক। দাউদ কররাণী খুব
অদূরদর্শী শাসক ছিলেন। বিশাল রাজ্য ও ধন ঐশ্বর্য দেখে তিনি নিজেকে সম্রাট
আকবরের সমকক্ষ ভাবতে থাকেন। এতদিন বাংলা ও বিহারের আফগান শাসকগণ প্রকাশ্যে
মুঘল সম্রাটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতেন। কিন' দাউদ স্বাধীন সম্রাটের মত
‘বাদশাহ’ উপাধি গ্রহণ করেন এবং নিজ নামে খুৎবা পাঠ করেন ও মুদ্রা জারি
করেন।
আফগানরা এমনিতেই মুঘলদের শত্রু ছিল। তার ওপর বাংলা-বিহার মুঘলদের অধিকারে
না থাকায় সম্রাট আকবরের স্বস্তি ছিলনা। দাউদ কররাণীর আচরণ আকবরকে বাংলা
আক্রমণের সুযোগ করে দিল। প্রথমে আকবর জৌনপুরের শাসনকর্তা মুনিম খানকে
নির্দেশ দেন কররাণী রাজ্য আক্রমণ করতে। প্রথমদিকে সরাসরি আক্রমণ করেননি
মুনিম খান। উজির লোদী খানের পরামর্শে মুনিম খানের সাথে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল।
দাউদ খান উজির লোদীর পরামর্শে মুনিম খানের সাথে ধনরত্ন দিয়ে আপোস করেন।
কিন্তু অচিরেই এ অবস্থার পরিবর্তন হয়। দাউদ কিছু ষড়যন্ত্রকারীর পরামর্শে
ভুল বোঝেন উজির লোদীকে। দাউদের নির্দেশে হত্যা করা হয় তাঁকে। লোদীর বুদ্ধির
গুণেই এতদিন মুঘল আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল বাংলা ও বিহার। মুনিম
খানের আর বাঁধা রইল না। মুনিম খান লোদীর মৃত্যুর পর ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে
বিহার থেকে আফগানদের হটিয়ে দেন। আফগানরা ইতোমধ্যে নিজেদের ভেতর বিবাদ করে
দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ সুযোগে মুনিম খান বাংলার দিকে অগ্রসর হন। কররাণীদের
বাংলার রাজধানী ছিল তাণ্ডায়। আফগানরা তান্ডা ছেড়ে পিছু হটে। আশ্রয় নেয়
হুগলী জেলার সপ্তগ্রামে। রাজধানী অধিকার করে মুঘল সৈন্যরাও অগ্রসর হয়
সপ্তগ্রাম-এ। দাউদ খান পালিয়ে যান উড়িষ্যায়। মুনিম খান তান্ডায় মুঘল
রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তান্ডায় পে- রোগ দেখা দিলে মুনিম খানসহ অনেক
মুঘল সৈন্য এ রোগে মারা যান। ফলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এগ অবস্থার সুযোগে
দাউদ কররাণী পশ্চিম ও উত্তর বাংলা পুনরায় অধিকার করে নেন। অন্যদিকে ভাটি
অঞ্চলের জমিদার ঈসা খান পূর্ব বাংলা থেকে মুঘল সৈন্যদের হটিয়ে দেন। মুঘল
সৈন্যরা এবার বাংলা ছেড়ে আশ্রয় নেয় বিহারে।
মুনিম খানের মৃত্যু সংবাদ আগ্রায় পৌঁছালে সম্রাট আকবর বাংলার শাসনকর্তা করে
পাঠান খান জাহান হুসেন কুলী খানকে। তাঁর সহকারী নিযুক্ত হন রাজা টোডরমল।
বাংলায় প্রবেশ পথে রাজমহলে মুঘল সৈন্যদের বাঁধা দেন দাউদ কররাণী। মুঘলদের
সাহায্যে এগিয়ে আসেন বিহারের শাসনকর্তা মুজাফফর খান তুরবাতি। ১৫৭৬
খ্রিষ্টাব্দে রাজমহলের নিকট মুঘল ও আফগানদের মধ্যে এক তুমুল যুদ্ধ হয়।
রাজমহলের যুদ্ধে দাউদ কররাণীর চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। পরে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড
দেওয়া হয়। এভাবে বাংলায় কররাণী আফগান শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুঘল শাসনের
সূত্রপাত হয়। অবশ্য ‘বার ভূঁইয়াদের’ বাঁধার মুখে মুঘল শাসন বেশি দূর বিস-ৃত
হতে পারেনি।
বার ভূঁইয়াদের ইতিহাস
সম্রাট আকবর সমগ্র বাংলার উপর তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। বাংলার
বড় বড় জমিদাররা মুঘলদের অধীনতা মেনে নেননি। জমিদারগণ তাঁদের নিজ নিজ
জমিদারীতে স্বাধীন ছিলেন। এদের শক্তিশালী সৈন্য ও নৌ-বহর ছিল। স্বাধীনতা
রক্ষার জন্য এঁরা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। বাংলার
ইতিহাসে এ জমিদারগণ ‘বার ভূঁইয়া’ নামে পরিচিত। এ ‘বার’ বলতে বারজনের সংখ্যা
বুঝায় না। ধারণা করা হয় অনির্দিষ্ট সংখ্যক জমিদারদের বোঝাতেই ‘বার’ শব্দটি
ব্যবহার করা হয়েছে।
বাংলার ইতিহাসে বার ভূঁইয়াদের আবির্ভাব ষোড়শ শতকের মধ্যবর্তীকাল হতে সপ্তদশ
শতকের মধ্যবর্তী সময়ে। আলোচ্য সময়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যাঁরা নিজেদের
স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন, ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে তাঁরাই ‘বার ভূঁইয়া’।
এছাড়াও বঙ্গদেশে আরও অনেক ছোটখাট জমিদার ছিলেন। তাঁরাও মুঘলদের বিরুদ্ধে
মাথা তুলে দাঁড়ান। কিন' পরে এঁরা মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। বার
ভূঁইয়াদের মধ্যে উলে- যোগ্য হলেন:
বার ভূইয়াদের নাম এলাকার নাম
ঈসা খান, মূসা খান
ঢাকা জেলার অর্ধাংশ, প্রায় সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা এবং
পাবনা, বগুড়া ও
রংপুর জেলার কিছু অংশ
চাঁদ রায় ও কেদার রায় শ্রীপুর (বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ)
বাহাদুর গাজী ভাওয়াল
সোনা গাজী সরাইল (ত্রিপুরার উত্তর সীমায়)
ওসমান খান বোকাইনগর (সিলেট)
বীর হামির বিষ্ণুপুর (বাকুড়া)
লক্ষণ মাণিক্য ভুলুয়া (নোয়াখালী)
পরমানন্দ রায় চন্দ্রদ্বীপ (বরিশাল)
বিনোদ রায়, মধু রায় চান্দপ্রতাপ (মানিকগঞ্জ)
মুকুন্দরাম, সত্রজিৎ ভূষণা (ফরিদপুর)
রাজা কন্দর্পনারায়ণ, রামচন্দ্র বরিশাল জেলার অংশ বিশেষ
প্রথম দিকে বার ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খান। হুসেন শাহী বংশের অবসান হলে
ঈসা খানের পিতা সুলায়মান খান সোনারগাঁও অঞ্চলে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেন।
খিজিরপুর দুর্গ ছিল তাঁর শক্তির প্রধান কেন্দ্র। সোনারগাঁও ও খিজিরপুরের
নিকটবর্তী কাত্রাবু তাঁর রাজধানী ছিল। দাউদ কররাণীর পতনের পর তিনি
সোনারগাঁও-এ রাজধানী স্থাপন করেন।
বার ভূঁইয়াদের দমন করার জন্য সম্রাট আকবর বিশেষ মনোযোগ দেন। এজন্য তিনি
১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে শাহবাজ খান, ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে সাদিক খান, ১৫৮৬
খ্রিস্টাব্দে উজির খান ও ১৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজা মানসিংহকে বাংলার সুবাদার
করে পাঠান। তাঁরা ঈসা খাঁন ও অন্যান্য জমিদারের সাথে বহুবার যুদ্ধ করেন।
কিন্তু বার ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খানকে সম্পূর্ণ পরাজিত করা সম্ভব হয়নি। তিনি
সম্রাট আকবরের আনুগত্য স্বীকারের বিনিময়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখেন।
অন্যদিকে তিনি মুঘলদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধি
ধারণ করেছিলেন।
১৫৯৯ খ্রিস্টাব্দে ঈশা খানের মৃত্যু হলে বার ভূঁইয়াদের নেতা হন তাঁর পুত্র
মূসা খান। এদিকে ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে মানসিংহকে দ্বিতীয়বারের মত বাংলায়
পাঠানো হয়। এবার মানসিংহ কিছুটা সফল হন। ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে মূসা খান এক
নৌ-যুদ্ধে মানসিংহের হাতে পরাজিত হন। কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করার আগে
সম্রাট আকবরের অসুস'তার খবর আসে। সম্রাটের ডাকে মানসিংহ আগ্রায় ফিরে যান।
সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সেলিন ‘জাহাঙ্গীর’ নাম ধারণ করে ১৬০৫
খ্রিস্টাব্দে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণী করেন। তিনি মানসিংহকে আবার বাংলায়
প্রেরণ করেন। এক বছর পর ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবুদ্দীন কোকাকে বাংলার
সুবাদার নিয়োগ করা হয়। কুতুবুদ্দীন শের আফকুনের হাতে প্রাণ হারান। তাঁর
পরবর্তী সুবাদার জাহাঙ্গীর কুলীখান এক বছর পর মারা যান। এর পর ইসলাম খান
১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গের সুবাদার নিযুক্ত হন।
বাংলার বার ভূঁইয়াদের দমন করে এদেশ মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠা সম্রাট জাহাঙ্গীরের
রাজত্বকালের কৃতিত্বপূর্ণ কার্য। আর এ কৃতিত্বের দাবিদার সুবাদর ইসলাম খান
(১৬০৮-১৬১৩ খ্রি:)। শাসনভার গ্রহণ করেই তিনি বুঝতে পারেন যে, বার
ভূঁইয়াদের নেতা মূসা খানকে দমন করতে পারলেই তাঁর পক্ষে অন্যান্য
জমিদারদেরকে বশীভূত করা সহজসাধ্য হবে। সেজন্য তিনি রাজমহল হতে ঢাকায়
রাজধানী স্থানান্তর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কারণ, মূসা খানের ঘাঁটি
সোনারগাঁও ঢাকার অদূরে ছিল। বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় আসার পথে
ইসলাম খান বেশ কজন জমিদারের আনুগত্য লাভ করেছিলেন।
বার ভূঁইয়াদের মোকাবেলা করার জন্য ইসলাম খান শক্তিশালী নৌ-বহর গড়ে তোলেন।
মূসা খানের সাথে প্রথম সংঘর্ষ বাঁধে ১৬০৯ খ্রিস্টাব্দে করতোয়া নদীর
পূর্বতীরে যাত্রাপুরে। এখানে মূসা খানের দুর্গ ছিল। যুদ্ধে মূসা খান ও
অন্যান্য জমিদার শেষ পর্যন্ত পিছু হটেন। ইসলাম খান ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায়
প্রবেশ করেন। এ সময় থেকে ঢাকা হয় বাংলার রাজধানী। সম্রাটের নাম অনুসারে
ঢাকার নাম রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীর নগর’।
এরপর পুনরায় মূসা খানের নেতৃত্বে মুঘলদের বাঁধা দেবার জন্য জমিদারদের
নৌ-বহর একত্রিত হয় শীতলক্ষ্যা নদীতে। ইসলাম খান এর পশ্চিম তীরের বিভিন্ন
স্থানে সৈন্যদল ও নৌ-বহর প্রেরণ করেন। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে ইসলাম খানের সঙ্গে
জমিদারদের যুদ্ধ শুরু হয়। নদীর পূর্ব পাড়ে অবসি'ত মূসা খানের কদম রসুল
দুর্গসহ অন্যান্য দুর্গ মুঘলদের অধিকারে আসে। অবস্থার বিপর্যয়ে মূসা খান
সোনারগাঁও চলে আসেন। রাজধানী নিরাপদ নয় মনে করে তিনি মেঘনা নদীতে অবসি'ত
ইব্রাহিমপুর দ্বীপে আশ্রয় নেন। মুঘল সৈন্যরা সোনারগাঁও অধিকার করে নেন। এর
ফলে জমিদারগণ বাধ্য হন আত্মসমর্পণ করতে। কোন উপায় না দেখে মূসা খানও শেষ
পর্যন্ত মুঘলদের নিকট আত্মসমর্পণে বাধ্য হন। ইসলাম খান মূসা খানকে অন্যান্য
জমিদারদের মতো তাঁকেও তাঁর জমিদারিতে মুঘলদের অধীনস' জায়গিরের দায়িত্ব
দিলেন। এরপর মূসা খান সম্রাটের অনুগত জায়গিরদার হিসেবে বাকি জীবন অতিবাহিত
করেন। মূসা খানের আত্মসমর্পণে অন্যান্য জামিদারগণ নিরাশ হয়ে মুঘল সম্রাটের
বশ্যতা স্বীকার করেন। এভাবে বাংলার বার ভূঁইয়াদের শাসনের অবসান ঘটে।
মুঘল শাসন (১৫৭৬-১৭৫৭ খ্রিঃ)
সুবাদারি ও নবাবি- এ দুই পর্বে বাংলায় মুঘল শাসন অতিবাহিত হয়। বার
ভূঁইয়াদের দমনের পর সমগ্র বাংলায় সুবাদারি প্রতিষ্ঠিত হয়। মুঘল প্রদেশগুলো
‘সুবা’ নামে পরিচিত ছিল। বাংলা ছিল মুঘলদের অন্যতম সুবা। সতের শতকের প্রথম
দিক থেকে আঠার শতকের শুরু পর্যন্ত ছিল সুবাদারী শাসনের স্বর্ণযুগ। সম্রাট
আওরঙ্গজেবের পর দিল্লিরী দুর্বল উত্তরাধিকারীদের সময়ে মুঘল শাসন শক্তিহীন
হয়ে পড়ে। এ সুযোগে বাংলার সুবাদারগণ প্রায় স্বাধীনভাবে বাংলা শাসন করতে
থাকেন। মুঘল আমলের এই যুগ ‘নবাবী আমল’ নামে পরিচিত।
সুবেদারী ও নবাবী আমল
সুবাদার ইসলাম খান ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে বার ভূঁইয়াদের দমন করে সমগ্র বাংলায়
সুবাদারি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৬১৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর বেশ কজন
সুবাদার বাংলার ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তবে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে সুবাদার মীর
জুমলা ক্ষমতা গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত কোন সুবাদারই তেমন গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রাখতে পারেননি। এঁদের মধ্যে ইসলাম খান চিশতি (১৬১৭-১৬২৪ খ্রিঃ) এবং
দিল্লির সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভাই ইব্রাহিম খান ফতেহ জঙ্গ (১৬১৭-১৬২৪খ্রিঃ)
বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতপর খুব অল্প সময়ের জন্য
সুবাদার নিযুক্ত হন দারার খান, মহব্বত খান, মুকাররম খান এবং ফিতাই খান।
সম্রাট শাহজাহান ক্ষমতা গ্রহণ করার পর বাংলার সুবাদার হিসেবে কাসিম খান
জুয়িনীকে নিয়োগ করেন ১৬২৮ খ্রিস্টাব্দে। হুসেন শাহী যুগ হতেই বাংলায়
পর্তুগীজরা বাণিজ্য করত। এ সময় পর্তুগীজ বণিকদের প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায়।
ক্রমে তা বাংলার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কাসিম খান জুয়িনী শক্ত হাতে
পর্তুগীজদের দমন করেন।
কাসিম খানের পর সুবাদার ইসলাম খান মাসহাদী (১৬৩৫-১৬৩৯ খ্রিঃ) চার বছর শাসন
করেন। অতঃপর শাহজাহান তাঁর দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজাকে বাংলার সুবাদার করে
পাঠান। সুজা কুড়ি বছর দায়িত্বে ছিলেন। মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ছিল সুজার
শাসনকাল। বিদেশি বণিক গোষ্ঠীর মধ্যে ইংরেজরা এ সময় সুবাদারের কাছ থেকে কিছু
বাড়তি সুবিধা লাভ করছিল। এতে বাণিজ্যের পাশাপাশি ইংরেজদের ক্ষমতাও বৃদ্ধি
পায়। ১৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শাহজাহান অসুস' হয়ে পড়লে তাঁর চার পুত্রের
প্রত্যেকেই সম্রাট হওয়ার জন্য বিদ্রোহ করে। এ সময় আওরঙ্গজেবের সাথে শাহ
সুজার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। দুই ভাইয়ের যুদ্ধে ১৬৫৯ খিস্টাব্দে শাহ সুজা
পরাজিত হন। পরাজিত হয়ে তিনি আরাকান গমন করেন। সেখানে পরে তিনি সপরিবারে
নিহত হন।
আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা সুজাকে দমন করার জন্য বাংলার রাজধানী
জাহাঙ্গীরনগর পর্যন্ত এসেছিলেন। তাই সম্রাট আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে
(১৬৬০-১৬৬৩ খ্রিঃ) বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব দেন। অহমদের বিরুদ্ধে তাঁর
সাফল্য তেমন উলে- যোগ্য না হলেও কুচবিহার ও আসাম বিজয় মীর জুমলার সামরিক
প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে।খ তাঁর সময়েই কুচবিহার সম্পূর্ণরূপে প্রথমবারের
মতো মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। আসাম অভিযানের দ্বারা তিনি মুঘল
সাম্রাজ্যের সীমান্ত আসাম পর্যন্ত বর্ধিত করেন।
মীর জুমলার মৃত্যুর পর প্রথমে দিলির খান ও পরে দাউদ খান অস্থায়ী সুবাদার
হিসেবে বাংলা শাসন করেন। অতপর আওরঙ্গজেবের মামা শায়েস্তা খানকে (১৬৬৪-১৬৮৮
খ্রিঃ) বাংলার সুবাদার নিয়োগ দেওয়া হয়।
মাঝখানে ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট তাঁকে দিলি-ত ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এরপর
১৬ে৭৯ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো বাংলার সুবাদার হন।
শায়েস্তা খান ছিলেন একজন সুদক্ষ সেনাপতি ও দূরদর্শী শাসক। তিনি মগদের উৎপাত
হতে বাংলার জনগণের জানমাল রক্ষা করেন। তিনি সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রাম অধিকার
করে আরাকানী জলদস্যুদের সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করেন। সুবাদার শায়েস্তা খান
কুচবিহার, কামরূপ, ত্রিপুরা প্রভৃতি অঞ্চলে মুঘল শাসন সুষ্ঠুভাবে
প্রতিষ্ঠিত করেন। সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তারও ব্যবস্থা করা হয়।
তাঁর ভয়ে আসামের রাজা মুঘলদের বিরুদ্ধে শত্রুতা করতে সাহস পাননি। সুবাদারীর
চিত্র : শায়েস্তা খানশেষ দিকে শায়েস্তা খানের সাথে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির বিরোধ বাঁধে। ইংরেজদের ক্ষমতা এত বৃদ্ধি পেতে থাকে যে তারা ক্রমে
এদেশের জন্য হুমকি হিসেবে দেখা দেয়। দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর শায়েস্তা খান
বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। শায়েস্তা খানের পর একে একে খান-ই-জাহান
বাহাদুর, ইব্রাহিম খান ও আজিমুদ্দিন বাংলার সুবাদার হন। তাঁদের সময় বাংলার
ইতিহাস তেমন ঘটনাবহুল ছিলনা।
শায়েস্তা খান তাঁর শাসন আমলের বিভিন্ন জনহিতকর কার্যাবলীর জন্য স্মরণীয় হয়ে
রয়েছেন। তাঁর সময়ে সাম্রাজ্যের সর্বত্র অসংখ্য সরাইখানা, রাস্তা ও সেতু
নির্মিত হয়েছিল। দেশের অর্থনীতি ও কৃষি ক্ষেত্রে তিনি অভাবিত সমৃদ্ধি আনয়ন
করেছিলেন। জনকল্যাণকর শাসনকার্যের জন্য শুধু বাংলায় নহে, সমগ্র ভারতবর্ষেও
তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর সময়ে দ্রব্য মূল্য এত সস্তা ছিল যে,
টাকায় আট মণ চাউল পাওয়া যেত।
শায়েস্তা খানের আমলে বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূলে ছিল শিল্প ও
ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার। এ আমলে কৃষি কাজের সঙ্গে শিল্প ও
ব্যবসা-বাণিজ্যেরও যথেষ্ট উন্নতি হয়। শায়েস্তা খান ব্যবসা-বাণিজ্যের
ক্ষেত্রে বিদেশী বণিকদিগকে উৎসাহিত করতেন।
শায়েস্তা খানের শাসনকাল বাংলার স্থাপত্য শিল্পের জন্য সবিশেষ উলে- যোগ্য।
বিচিত্র সৌধমালা, মনোরম সাজেখ সজ্জিত তৎকালীন ঢাকা নগরী স্থাপত্য শিল্পের
প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগের সাক্ষ্য বহন করে। স্থাপত্য শিল্পের বিকাশের জন্য এ
যুগকে বাংলায় মুঘলদের ‘স্বর্ণযুগ’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। তাঁর আমলে
নির্মাণ করা স্থাপত্য কার্যের মধ্যে ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লি, বিবি পরীর
সমাধি-সৌধ, হোসেনী দালান, সফী খানের মসজিদ, বুড়িগঙ্গার মসজিদ, চকা মসজিদ
প্রভৃতি উলে- যোগ্য। মোটকথা, অন্য কোনো সুবাদার বা শাসনকর্তা ঢাকায়
শায়েস্তা খানের ন্যায় নিজেরখ স্মৃতিকে এত বেশি জ্বলন্ত রেখে যেতে পারেননি।
বস'ত, ঢাকা ছিল শায়েস্তা খানের নগরী।
দক্ষ সুবাদার হিসাবে এবার বাংলার ক্ষমতায় আসেন মুর্শিদ কুলী খান (১৭০০-১৭২৭
খ্রিঃ)। প্রথমে তাঁকে বাংলার দিউয়ান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দিউয়ানের কাজ
ছিল সুবার রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা। সম্রাট ফখরুখ
শিয়ারের রাজত্বকালে মুর্শিদ কুলী খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন। মুর্শিদ
কুলী খান যখন বংলায় আগমনণ করেন তখন বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা
শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। এ পরিসি'তির মুখে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সহিত বাংলায়
মুঘল শাসন পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। স্বীয় ব্যক্তিত্ব, বিচক্ষণতা ও
বুদ্ধিমত্তা দ্বারা তিনি বাংলার ইতিহাসের গতিকে পরিবর্তিত করেছিলেন।
সম্রাট আওঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দুর্বল মুঘল সম্রাটগণ দূরবর্তী সুবাগুলোর
দিকে তেমন দৃষ্টি দিতে পারেননি। ফলে এসব অঞ্চলের সুবাদারগণ অনেকটা
স্বাধীনভাবে নিজেদের অঞ্চল শাসন করতে থাকেন। মুর্শিদ কুলী খানও অনেকটা
স্বাধীন হয়ে পড়েন। তিনি নামমাত্র সম্রাটের আনুগত্য প্রকাশ করতেন এবং
বার্ষিক ১ কোটি ৩ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাঠাতেন। মুর্শিদ কুলী খানের পর তাঁর
জামাতা সুজাউদ্দিন খান বাংলার সিংহাসনে বসেন। এভাবে বাংলার সুবেদারি বংশগত
হয়ে পড়ে। আর এরই পথ ধরে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলার স্বাধীন শাসন।
নবাব মুর্শিদ কুলী খানের সময় থেকেই বাংলা সুবা প্রায় স্বাধীন হয়ে পড়ে। এ
সময় সুবাকে বলা হতো ‘নিজামত’ আর সুবাদারের বদলে পদবী হয় ‘নাজিম’। নাজিম
পদটি হয়ে পড়ে বংশগত। সুবাদার বা নাজিমগণ বাংলার সিংহাসনে বসে মুঘল সম্রাটের
কাছ থেকে শুধু একটি অনুমোদন নিয়ে নিতেন। তাই আঠারো শতকের বাংলায় মুঘল
শাসনের ইতিহাস নিজামত বা নবাবি আমলরূপে পরিচিত। আর প্রায় স্বাধীন শাসকগণ
পরিচিত হন ‘নবাব’ হিসেবে।
রাজস্ব সংস্কার মুর্শিদ কুলী খানের সর্বাধিক স্মরণীয় কীর্তি। তিনি ভূমি
জরিপ করে রায়তদের সামর্থ্য অনুযায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করেছিলেন। রাজস্ব
আদায়কে নিশ্চিত ও নিয়মিত করার জন্য তিনি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি কর্মচারীদের সাহায্যে ভূমির প্রকৃত উৎপাদিকা শক্তি ও বাণিজ্য করের
সঠিক তথ্য সংগ্রহ করতেন। এ পদ্ধতিতে মধ্যস' ব্যক্তিদের দ্বারা প্রজাদের
হয়রানির কোনো সুযোগ ছিল না।
মুর্শিদ কুলী খান দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসারের
গুরুত্ব বিশেষভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ইংরেজ, ফরাসী ও
পারসিক ব্যবসায়ীদেরকে তিনি উৎসাহ প্রদান করতেন। ব্যবসায়ীরা যাতে নির্দিষ্ট
প্রচলিত কর প্রদান করে এবং তাদের প্রতি যাতে কোনো অবিচার করা না হয় সেদিকে
দৃষ্টি রাখার জন্য সংশি-ষ্ট কর্মচারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর
পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য সমপ্রসারিত হয়েছিল। কলকাতা,
চুঁচুড়া ও চন্দননগর বিভিন্ন বিদেশী বণিকদের ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে
উঠে।
মুর্শিদ কুলী খানের কোনো পুত্র সন্তান ছিলনা। তাই তাঁর কন্যা
জিনাত-উন-নিসার স্বামী সুজাউদ্দিন খানকে (১৭২৭- ১৭৩৯ খ্রিঃ) সম্রাট ফররুখ
শিয়ার বাংলার সুবাদার নিয়োগ করেন। সুজাউদ্দিন একজন স্বাধীন নবাবের মর্যাদা
নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শাসক। বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা-
তিন প্রদেশেরই নবাব হয়েছিলেন তিনি। তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজন ও বিশ্বাসভাজনদের
উচ্চপদ দান করেন। জমিদারদের সাথেও একটি সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। কিন্তু
সুজাউদ্দিনের শেষ জীবন সুখে কাটেনি। প্রাসাদের অনেক কর্মকর্তা তাঁর
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। কিন্তু দক্ষ হাতে তিনি সংকট মোকাবিলা করেন।
সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সরফরাজ খান বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব
হন। তাঁর অযোগ্যতার কারণে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এ সুযোগে বিহারের
নায়েব-ই-নাজিম আলীবর্দী খান সরফরাজকে আক্রমণ করেন। সরফরাজ পরাজিত ও নিহত
হন। মুঘল সম্রাটের অনুমোদনে নয়, বাহুবলে বাংলার ক্ষমতা দখল করেন আলীবর্দী
খান। আলীবর্দীর শাসনকালে (১৭৪০-১৭৫৬ খ্রি:) বাংলায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
অনেকদিন থেকেই বর্গী নামে পরিচিত মারাঠি দস্যুরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে
আক্রমণ করে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। আলীবর্দী খান ১৭৪২ থেকে ১৭৫১
খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর প্রতিরোধ করে বর্গীদের দেশ ছাড়া করতে সক্ষম হন।
তাঁর শাসনকালে আফগান সৈন্যরা বিদ্রোহ করলে তিনি শক্ত হাতে তা দমন করেন।
আলীবর্দীর সময়ে ইংরেজসহ অনেক ইউরোপীয় বণিকের বাণিজ্যিক তৎপরতা বাংলার
বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। একই সাথে এরা সামরিক শক্তিও সঞ্চয় করতে থাকে।
আলীবর্দী খান শক্ত হাতে বণিকদের তৎপরতা রোধ করেন।
আলীবর্দী খান তাঁর কনিষ্ঠ কন্যা আমেনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলাকে তাঁর
উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। আলীবর্দীর প্রথম কন্যা ঘষেটি বেগমের ইচ্ছে ছিল
তাঁর দ্বিতীয় ভগ্নির পুত্র শওকত জঙ্গ নবাব হবেন। ফলে তিনি সিরাজউদ্দৌলার
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। কয়েকজন অভিজাতের সমর্থন লাভ করেন ঘষেটি
বেগম। এদের মধ্যে রায় দুর্লভ,
জগৎশেঠ, মীরজাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লি প্রমুখের নাম করা যায়। প্রাসাদের ভেতর এ
ষড়যন্ত্রকে কাজে লাগায় বাংলায়ভ বাণিজ্য করতে আসা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির
সুচতুর ইংরেজ বণিকরা। ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে তারা হাত মেলায়। অবশেষে
ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ বাধে নবাবের। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাবের
সেনাপতি মীরজাফর বিশ্বাসঘাতকতা করে যুদ্ধে অংশগ্রহণে বিরত থাকেন। অসহায়ভাবে
পরাজয় ঘটে সিরাজউদ্দৌলার। এভাবেই পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ
শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। আর একই সাথে বাংলার মধ্যযুগেরও অবসান ঘটে।
এই ব্লগের লেখাসমূহ সরাসরি বোর্ড বই থেকে উদ্ধৃত এবং Creative Commons
Attribution-NonCommercial-NoDerivatives 4.0 International License এর
আওতায় প্রকাশিত।
Subscribe to:
Posts (Atom)